Advertisement Banner

পয়লা বৈশাখ: ইতিহাস, প্রতিরোধ ও জাতিসত্তার নির্মাণ

রিজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
রিজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
পয়লা বৈশাখ: ইতিহাস, প্রতিরোধ ও জাতিসত্তার নির্মাণ
পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রা। ছবি: বাসস

পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, কেবল একটি উৎসব নয়-এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক জটিল ও বহুমাত্রিক প্রতীক। এই দিনটি আজ যে রূপে উদযাপিত হয়, তা কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় ঐতিহ্য নয়; বরং এটি সময়ের সাথে সাথে রূপান্তরিত হয়েছে, বিশেষত ঔপনিবেশিকতা, পাকিস্তানি শাসন ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে।

পয়লা বৈশাখকে একটি সরল ‘ঐতিহ্য’ হিসেবে পড়া আসলে তার জটিল ইতিহাসকে আড়াল করে; বরং এটিকে একটি ধারাবাহিকভাবে পুনর্লিখিত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র হিসেবে বোঝা অধিকতর ফলপ্রসূ। মুঘল আমলে আকবরের রাজস্ব সংস্কারের প্রেক্ষিতে যে ফসলি সনের উদ্ভব—যার উল্লেখ আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিআকবরনামাতে পাওয়া যায়—তা মূলত একটি অর্থনৈতিক সময়-প্রযুক্তি ছিল; কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে, বিশেষত ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর, এটি ধীরে ধীরে সামাজিক আচার ও বাজারভিত্তিক সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে সাংস্কৃতিক দমনের প্রেক্ষিতে ছায়ানটের উদ্যোগে এটি একটি প্রতিরোধী সাংস্কৃতিক অনুশীলনে পরিণত হয়, যা স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র কর্তৃক জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত হয় এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো উপাদানের মাধ্যমে দৃশ্যমান রূপ পায় (যা পরবর্তীতে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত)। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে, বিশেষত ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, এই উৎসবের নাম ও প্রতীককে ঘিরে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা দেখায় যে পয়লা বৈশাখ আসলে একটি ‘কন্টেস্টেড সাংস্কৃতিক পাঠ’, যেখানে রাষ্ট্র, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও নাগরিক সমাজ পরস্পরের সাথে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে। এই ধারাবাহিক রূপান্তরকে আন্তোনিও গ্রামশির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’, এরিক হবসবমের ‘উদ্ভাবিত ঐতিহ্য’ এবং মিশেল ফুকোর ‘বয়ান-ক্ষমতা’ তত্ত্বের আলোকে পড়লে স্পষ্ট হয় যে, পয়লা বৈশাখ কোনো স্থির ঐতিহ্য নয়; বরং এটি একটি ‘টেম্পোরাল-কালচারাল প্যালিম্পসেস্ট’, যেখানে প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তার নিজস্ব রাজনৈতিক ও আদর্শিক অর্থ আরোপ করে।

মুঘল আমল ও অর্থনৈতিক ক্যালেন্ডারের উৎপত্তি: ইতিহাস, বিতর্ক ও ধর্মীয় প্রেক্ষিত

বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি নিয়ে যে প্রচলিত বয়ানটি আমরা দেখি, তা মূলত মুঘল সম্রাট আকবরের প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত; তবে এই বয়ানকে সরলীকৃত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সমস্যাজনক। ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব কাঠামো যখন কৃষিনির্ভর অর্থনীতির উপর অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে, তখন ইসলামি হিজরি ক্যালেন্ডার এর সম্পূর্ণ চান্দ্র প্রকৃতি কৃষি মৌসুমের সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করছিল—যা খাজনা নির্ধারণ ও আদায়ে প্রশাসনিক অকার্যকারিতা তৈরি করছিল। এই প্রেক্ষাপটে আকবরের দরবারের প্রধান ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরি এবং আকবরনামা-এ যে রাজস্ব সংস্কারের বিবরণ দিয়েছেন, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে একটি সৌরভিত্তিক সময়-গণনার প্রয়োজনীয়তা প্রশাসনিকভাবে অনুভূত হচ্ছিল। আধুনিক ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব তার এগ্রেরিয়ান সিস্টেম অব মুঘল ইন্ডিয়া গ্রন্থে যুক্তি দেন যে এই ‘ফসলি সন’ মূলত ছিল একটি ফিসকাল র‍্যাশনালাইজেশন টুল, যার লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন চক্রের সাথে রাজস্ব বর্ষকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা না যে কোনো সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় ক্যালেন্ডার নির্মাণ।

এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলা সন আদৌ আকবরের ‘উদ্ভাবন’ কি না, নাকি এটি পূর্ব-বিদ্যমান আঞ্চলিক সৌর ক্যালেন্ডারের একটি প্রশাসনিক পুনর্গঠন। অধিকাংশ সমসাময়িক গবেষণা একটি হাইব্রিড ফরমেশন থিসিস এর দিকে ঝুঁকে, যেখানে ধরা হয় যে বঙ্গ অঞ্চলে পূর্ব থেকেই প্রচলিত সৌরভিত্তিক গণনার সাথে মুঘল প্রশাসনিক সংস্কার যুক্ত হয়ে একটি কার্যকর ক্যালেন্ডার কাঠামো তৈরি করে। ফলে ‘পয়লা বৈশাখ’ আদিতে কোনো উৎসব নয়; বরং এটি ছিল একটি এগ্রেরিয়ান ফিসকাল মার্কার, যার মাধ্যমে নতুন হিসাববর্ষ শুরু হতো। এখানে লক্ষণীয় যে আকবর নিজে একজন মুসলিম শাসক হলেও তার শাসনদর্শন ছিল কঠোর শরিয়াভিত্তিক নয়; বরং ‘সুলহ-ই-কুল’ নীতির মাধ্যমে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে তার প্রবর্তিত ‘দিন-ই-ইলাহি’ ধারণায়ও প্রতিফলিত হয়। এই ধর্মীয়-দার্শনিক অবস্থানের কারণে সমকালীন অনেক ইসলামি আলেম তার সমালোচনা করলেও প্রশাসনিক বাস্তবতায় তিনি মুসলিম সম্রাট হিসেবেই স্বীকৃত ছিলেন যা এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা যোগ করে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—মুঘল আমলে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে কোনো ‘মুসলিম বনাম অমুসলিম’ ধরনের দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। কারণ, এই সময়ে এটি কোনো ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে গড়ে ওঠেনি; বরং ছিল একটি প্রশাসনিক সময়-চিহ্ন, যা কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। অতএব, পয়লা বৈশাখকে ঘিরে যে ধর্মীয় বিতর্ক আমরা সমকালীন সমাজে প্রত্যক্ষ করি, তা মূলত একটি রেট্রোস্পেকটিভ আইডিওলজিক্যাল কনস্ট্রাকশন যেখানে একটি প্রশাসনিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ফ্রেমে পুনর্ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, পয়লা বৈশাখের উৎপত্তি ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রয়োজনে গঠিত একটি সময়-প্রযুক্তি (টাইম-রেকনিং টেকনোলজি), যা পরবর্তী ইতিহাসে সাংস্কৃতিক জাতিসত্তার এক শক্তিশালী প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক যুগ ও সংস্কৃতির পুনর্গঠন: অর্থনীতি, ‘ড্রেসড’ সংস্কৃতি ও শ্রেণিগত রূপান্তর

ঔপনিবেশিক বাংলায় পয়লা বৈশাখের রূপান্তরকে বোঝার জন্য এটিকে কেবল একটি লোকজ উৎসব হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; বরং এটি ছিল একটি সময়, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি ঔপনিবেশিক পুনর্গঠন, যেখানে প্রশাসনিক ক্যালেন্ডার ধীরে ধীরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আচার-অনুশীলনে রূপান্তরিত হয়। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর বাংলার রাজস্ব কাঠামোতে যে মৌলিক পরিবর্তন আসে, তা সময়-গণনার প্রথাকেও প্রভাবিত করে। বিশেষত ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারি ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, যার ফলে খাজনা আদায়ের নির্দিষ্ট বার্ষিক চক্র আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা সন—যার শিকড় মুঘল ফসলি ব্যবস্থায়—ব্রিটিশ প্রশাসনিক অর্থনীতির সাথেও কার্যকরভাবে যুক্ত থাকে।

ঊনবিংশ শতকে (বিশেষত ১৮২০–১৮৮০-এর মধ্যে) পয়লা বৈশাখ ধীরে ধীরে একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক আচার হিসেবে নতুন অর্থ লাভ করে, যার অন্যতম উদাহরণ ‘হালখাতা’। ব্যবসায়ীরা এই দিনে পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন—যা একদিকে অর্থনৈতিক রীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, অন্যদিকে এটিকে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানেও পরিণত করে। ইতিহাসবিদ সুগত বসু এবং রণজিৎ গুহের সাবঅল্টার্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যায়, এই ধরনের আচার ছিল ‘এভরিডে ফর্মস অব ইকোনমিক রিচুয়াল’, যা ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই স্থানীয় সমাজ নিজের এজেন্সি পুনর্গঠন করছিল।

তবে এই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে—যাকে বলা যেতে পারে ‘কালচারাল ড্রেসিং অব অ্যান ইকোনমিক ক্যালেন্ডার’। অর্থাৎ, পয়লা বৈশাখের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ঘিরে একটি নান্দনিক, প্রতীকী ও উৎসবমুখর আবরণ (ড্রেস) তৈরি হয়। ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে (১৮৭০–১৯০০) গ্রামীণ মেলা, লোকসংগীত, পুতুলনাচ ইত্যাদির মাধ্যমে এটি একটি ‘ফেস্টিভ পাবলিক কালচার’-এ রূপ নিতে শুরু করে। এই রূপান্তরকে হবসবমের ‘ইনভেন্টেড ট্র্যাডিশন’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়—যেখানে নতুন সামাজিক বাস্তবতাকে বৈধতা দিতে ঐতিহ্যের আকারে উপস্থাপন করা হয়। অর্থাৎ, পয়লা বৈশাখ এখানে আর কেবল হিসাববর্ষের সূচনা নয়; এটি একটি ‘পারফর্মড ট্র্যাডিশন’, যা ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি সাংস্কৃতিক কৌশল।

এখানে ‘ড্রেস/দণ্ড’ (ড্রেস/ফরম্যাটিং অব কালচার) ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক সময়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত (ভদ্রলোক) শ্রেণি—যাদের উত্থান ঘটে মূলত ১৮৩০–১৯১০-এর মধ্যে—এই উৎসবকে একটি ‘রিফাইন্ড কালচারাল ফর্ম’-এ রূপ দিতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, কলকাতাকেন্দ্রিক নবজাগরণ পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে ঋতুভিত্তিক নান্দনিকতার সাথে যুক্ত করেন, যা পরবর্তীতে গান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় প্রভাব ফেলে। ফলে একটি দ্বৈত কাঠামো তৈরি হয়—

একদিকে গ্রামীণ লোকজ মেলা (পপুলার কালচার), অন্যদিকে নাগরিক-ভদ্রলোক সংস্কৃতি (এলিট কালচারাল প্রোডাকশন)।

সমালোচনামূলকভাবে বলতে গেলে, এই পুনর্গঠন ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত নয়; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মধ্যে একটি নেগোশিয়েটেড কালচারাল ফরমেশন। সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ-এর আলোকে দেখা যায়, পয়লা বৈশাখের এই রূপান্তর একদিকে উপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ফল, অন্যদিকে স্থানীয় সমাজের প্রতিরোধ ও অভিযোজনের প্রকাশ। তবে এখানে একটি অন্তর্নিহিত শ্রেণিগত বিভাজনও তৈরি হয়—যেখানে ‘উৎসব’ ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত নান্দনিকতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী হয়ে পড়ে।

অতএব, ঔপনিবেশিক যুগে পয়লা বৈশাখের যে ‘দণ্ড’ বা কাঠামো তৈরি হয়, তা তিনটি স্তরে বোঝা যায়—

(১) অর্থনৈতিক দণ্ড (ইকোনমিক স্ট্রাকচার): ১৭৯৩-এর পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট-এর পর খাজনা ও হিসাববর্ষের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ

(২) সাংস্কৃতিক ড্রেসিং (কালচারাল ড্রেসিং): ১৮৭০–১৯০০-এর মধ্যে লোকজ উৎসব ও মেলার বিস্তার

(৩) নান্দনিক-ভদ্রলোক দণ্ড (এলিট কালচারাল ফ্রেমিং): ১৮৩০–১৯১০-এর নবজাগরণ পর্বে বৈশাখের শিল্প-সাহিত্যিক রূপায়ণ

এই তিনটি স্তরের সমন্বয়ে পয়লা বৈশাখ ঔপনিবেশিক বাংলায় একটি জটিল, বহুমাত্রিক এবং শ্রেণিগতভাবে স্তরবিন্যস্ত সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়—যা পরবর্তী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

নির্বাচিত সরকার-পরবর্তী সময়ে পয়লা বৈশাখের নাম-দ্বন্দ্ব: ক্ষমতা, প্রতীক ও হেজেমনির রাজনীতি

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর পয়লা বৈশাখের নাম—বিশেষত মঙ্গল শোভাযাত্রা—নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠে, তা কোনো আকস্মিক সাংস্কৃতিক বিতর্ক নয়; বরং এটি একটি গভীর পলিটিক্যাল-সিম্বলিক স্ট্রাগল, যেখানে রাষ্ট্র, মতাদর্শ ও জাতীয় পরিচয়ের পুনর্গঠন একে অপরের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

এই দ্বন্দ্বকে বোঝার জন্য তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ:

(১) সাংস্কৃতিক প্রতীকের পুনর্দখল (সিম্বলিক রি-অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন)

(২) ডিপলিটিসাইজেশন স্ট্র্যাটেজি

(৩) নির্বাচনী বৈধতার অধীনে পরিচয়ের পুনর্গঠন (আইডেন্টিটি রিক্যালিব্রেশন আন্ডার ইলেক্টোরাল লেজিটিমেসি)

প্রথমত, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার সাধারণত নিজের বৈধতা (লেজিটিমেসি) শক্তিশালী করতে চায় একটি ‘ইনক্লুসিভ ন্যাশনাল ন্যারেটিভ’ নির্মাণের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র এমন প্রতীকগুলোকে পুনর্নামকরণ বা পুনর্বিন্যাস করতে চায়, যেগুলো পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সময়ে নির্দিষ্ট মতাদর্শের সাথে যুক্ত ছিল। মঙ্গল শোভাযাত্রার ক্ষেত্রে সমস্যাটি এখানেই: ১৯৮৯ সালে এর সূচনা থেকেই এটি কেবল সাংস্কৃতিক নয়, বরং একটি অ্যান্টি-অথরিটারিয়ান এবং সেক্যুলার রেজিস্ট্যান্স সিম্বল হিসেবে গড়ে উঠেছে। ফলে নতুন সরকার যখন এটিকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বা আরও নিরপেক্ষ নামে রূপান্তর করতে চায়, তখন সমর্থকরা এটিকে ‘ইনক্লুসিভ রিফর্ম’ হিসেবে দেখলেও সমালোচকরা এটিকে হিস্টোরিক্যাল মেমরি ইরেজার বলে ব্যাখ্যা করেন।

অর্থাৎ, দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে—কে সংস্কৃতির অর্থ নির্ধারণ করবে?

দ্বিতীয়ত, এখানে একটি স্পষ্ট ডিপলিটিসাইজেশন স্ট্র্যাটেজি কাজ করে। নির্বাচিত সরকার প্রায়ই চায় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে ‘রাজনীতিমুক্ত’ (নিউট্রালাইজড) হিসেবে উপস্থাপন করতে, যাতে তা সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু সমস্যা হলো—মঙ্গল শোভাযাত্রা নিজেই একটি রাজনৈতিক ইতিহাস বহন করে; এটি সামরিক শাসন, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা ছিল। ফলে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে যখন এই রাজনৈতিক ধারাটি ‘সফটেন্ড’ বা ‘স্যানিটাইজড’ করা হয়, তখন শিল্পী, শিক্ষার্থী ও বুদ্ধিজীবীরা এটিকে দেখেন একটি স্টেট-লেড কালচারাল ডাইলিউশন হিসেবে।

এই প্রতিক্রিয়াই দ্বন্দ্বকে তীব্র করে তোলে।

তৃতীয়ত, নির্বাচিত সরকারের অধীনে একটি নতুন ধরনের আইডেন্টিটি রিক্যালিব্রেশন ঘটে। গণতান্ত্রিক ম্যানডেট পাওয়ার পর সরকার প্রায়ই একটি বিস্তৃত ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে—যার মধ্যে ধর্মীয় সংবেদনশীল গোষ্ঠীগুলিও অন্তর্ভুক্ত থাকে। পয়লা বৈশাখ, বিশেষত এর কিছু প্রতীক (মুখোশ, মঙ্গল, শোভাযাত্রা) কিছু গোষ্ঠীর কাছে ‘অইসলামিক’ বা ‘অপ্রচলিত’ হিসেবে প্রতিভাত হওয়ায়, সরকার একটি মধ্যপন্থা গ্রহণ করতে চায়—যেখানে উৎসব থাকবে, কিন্তু তার ভাষা হবে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ।

এই অবস্থানটি মূলত একটি পলিটিক্যাল ব্যালান্সিং অ্যাক্ট—কিন্তু এর ফলেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, কারণ একদিকে এটি ধর্মীয় আপত্তিকে আংশিক স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কর্মীরা এটিকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখেন।

এখানে আন্তোনিও গ্রামশির ‘কালচারাল হেজেমনি’ ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নির্বাচিত সরকার কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়, বরং সাংস্কৃতিক অর্থের উপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়—অর্থাৎ, কোন প্রতীক কী অর্থ বহন করবে তা নির্ধারণের ক্ষমতা। পয়লা বৈশাখের নাম-পরিবর্তন সেই হেজেমনিক প্রজেক্ট-এরই অংশ, যেখানে রাষ্ট্র একটি ‘অ্যাকসেপ্টেবল কালচার’ তৈরি করতে চায়। কিন্তু নাগরিক সমাজ, শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে—ফলে এটি একটি হেজেমনিক স্ট্রাগল-এ পরিণত হয়।

সবশেষে বলা যায়, এই নাম-দ্বন্দ্ব মূলত তিনটি স্তরে কাজ করছে—

মেমরি বনাম রিফর্ম: ঐতিহ্য সংরক্ষণ বনাম নতুনভাবে উপস্থাপন

পলিটিক্স বনাম নিউট্রালিটি: সাংস্কৃতিক প্রতীকের রাজনৈতিক অর্থ বনাম নিরপেক্ষতার দাবি

সেক্যুলার বনাম রিলিজিয়াস সেনসিবিলিটি: অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ বনাম ধর্মীয় সংবেদনশীলতা

ডিজিটাল যুগে পয়লা বৈশাখ: হেট স্পিচ, প্রতীকের রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণ

পয়লা বৈশাখকে ঘিরে সমসাময়িক সময়ে যে হেট স্পিচ, নেগেটিভিটি ও কাউন্টার-ডিসকোর্স তৈরি হয়েছে, তা বিচ্ছিন্ন কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত ইনফরমেশন ডিসঅর্ডার, আইডিওলজিক্যাল পোলারাইজেশন এবং সাংস্কৃতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের ফল। ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে যে ডিজিটাল অপতথ্য ও প্রোপাগান্ডার বিস্তার ঘটে—যেখানে নির্বাচনের আগে হাজার হাজার ভুয়া বা বিকৃত তথ্য ছড়ানো হয়েছিল—তা সরাসরি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে, কারণ একই নেটওয়ার্কগুলো সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরিতে সক্রিয় হয়। এই প্রেক্ষাপটে পয়লা বৈশাখকে লক্ষ্য করে যে হেট স্পিচ তৈরি হয়েছে, তা মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে:

(১) ধর্মীয় ভাষ্য নির্মাণ, যেখানে উৎসবকে ‘অইসলামিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়

(২) প্রতীকের রাজনৈতিক পুনর্ব্যাখ্যা, যেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো উপাদানকে ‘বিতর্কিত’ বা ‘আরোপিত সংস্কৃতি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়

(৩) ডিজিটাল মোবিলাইজেশন, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ভয়, গুজব ও ঘৃণা ছড়িয়ে সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করা হয়

বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে পয়লা বৈশাখ নিয়ে ‘ইচ্ছাকৃত বিতর্ক উসকে দেওয়া’ এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে, যা বিশিষ্ট নাগরিকদের ভাষায় ‘এক্সট্রিমিস্ট কমিউনাল অ্যাটেম্পটস’ হিসেবে চিহ্নিত। একইসাথে, এই হেট স্পিচ কেবল মতামতের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি বাস্তব সহিংসতার সাথেও সংযুক্ত—যেমন ২০২৫ সালে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটে হামলা বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি, যা দেখায় যে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক ভাষ্য ধীরে ধীরে ম্যাটেরিয়াল ভায়োলেন্স-এ রূপ নিতে পারে। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই নেগেটিভিটি একটি বৃহত্তর অসহিষ্ণুতা প্রবণতার অংশ, যেখানে গবেষণামূলক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে পয়লা বৈশাখবিরোধী প্রতিক্রিয়া আসলে ‘ইনটলারেন্স অ্যান্ড র‍্যাডিকালিজম’-এর একটি লক্ষণ, যা সংখ্যালঘু ও ভিন্ন সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও সমান্তরালভাবে কাজ করছে। ফলে সমকালীন পয়লা বৈশাখ-বিতর্ককে শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক মতভেদ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; বরং এটি একটি ডিসকার্সিভ ব্যাটলফিল্ড, যেখানে হেট স্পিচ একটি রাজনৈতিক টুল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—সংস্কৃতির অর্থ পুনর্নির্ধারণ, জনগণকে মেরুকরণ এবং সামাজিক বাস্তবতাকে পুনর্গঠনের জন্য।

পরিশেষ

পয়লা বৈশাখকে যদি আমরা কেবল একটি উৎসব হিসেবে দেখি, তবে আমরা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটিকে হারিয়ে ফেলি—এটি আসলে সময়ের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্মৃতি, যেখানে ইতিহাস, মানুষ, ভাষা ও আত্মপরিচয় একসূত্রে গাঁথা। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে একে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সংকীর্ণ ফ্রেমে আবদ্ধ করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু একটি উৎসবকে বিতর্কিত করা নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, যা বাঙালিকে বাঙালি করে তোলে। পয়লা বৈশাখ তাই আজ আমাদের সামনে শুধু আনন্দের দিন নয়, বরং একটি আয়না—যেখানে আমরা দেখতে পাই, আমাদের সংস্কৃতি কি নিজস্ব বহুত্ব ও মানবিকতায় টিকে থাকবে, নাকি তাকে ভেঙে ফেলা হবে বিভাজনের ভাষায়। এই দ্বন্দ্বের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ: আমরা কি আমাদের ইতিহাসকে ধারণ করে এগোব, নাকি তাকে ভুলে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাব।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত