
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিমুখী সংঘর্ষ
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রপ্রদর্শনী ও আলোচনা সভা চলাকালে এক ভয়াবহ সংঘাতের সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসন এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ দ্রুত সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দাবিসহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে একদল শিক্ষার্থী ও নেতাকর্মী অডিটোরিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করলে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। সেখানে উপস্থিত ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের তর্কবিতর্ক ও বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং মুখোমুখি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অডিটোরিয়ামের ভেতর থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুতই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ধাওয়া খেয়ে এক পক্ষ ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেলে, দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ রক্তক্ষয়ী রূপ নেয় নিকটস্থ ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ও অবস্থান নেওয়া আহতদের কেন্দ্র করে উভয়পক্ষ লাঠিসোটা, ইটপাটকেল ও নারকেলের ছোবড়া নিক্ষেপসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় জবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইয়াসিন সাইফ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া জবি প্রেস ক্লাবের একজন সাংবাদিকসহ উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সূত্রাপুর থানা পুলিশ ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এই ঘটনা খতিয়ে দেখতে ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের (আইইআর) পরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঢাকা কলেজে শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ
রাজধানীর ঢাকা কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ছাত্রশিবির আয়োজিত একটি আলোচনা সভার কক্ষ সাজানো ও ব্যানার টানানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
অডিটোরিয়াম ও গ্যালারি কক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি চলাকালে বহিরাগতদের উপস্থিতি ও কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আপত্তি জানান। এই নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা, লোহার রড ও ইটপাটকেল নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এতে ক্যাম্পাসজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। সংঘাতের এক পর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে প্রধান ফটক ও কলেজসংলগ্ন মিরপুর রোডেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে সাময়িকভাবে যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।
এই ঘটনায় ছাত্রশিবির দাবি করে, তাদের অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে।
পরে খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ও কলেজ প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় সংঘর্ষ
রাজধানীর সরকারি ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
হল প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং পূর্বের অসন্তোষকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা ও ধাওয়া শুরু হয়। পরে লাঠিসোঁটা, রড ও ইটপাটকেল নিয়ে মুখোমুখি হামলায় জড়ায় দুই পক্ষ। সংঘাতের সময় পুরো মাদরাসা চত্বর ও সংলগ্ন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয় পথচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও পুরো আলিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান চরচাকে বলেন, “মাদ্রাসার ক্যাম্পাসে এবং হলে ছাত্রদল-শিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিলে এই সিচুয়েশন তৈরি হয়। আমরা এনাফ ফোর্স মোতায়েন করেছি। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করেছি। আশা করছি, অপ্রীতিকর ঘটনা আর ঘটবে না।”
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
এসব ঘটনায় ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, “ছাত্রদল কখনোই শিবির বা ছাত্রলীগের মতো সন্ত্রাসী আচরণ কিংবা কারও চরিত্রহনন করবে না এবং উসকানির মুখেও আদর্শিক রাজনীতির চর্চা ধরে রাখবে।”
একই সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং সার্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, “ক্যাম্পাসগুলোকে শান্ত থাকতে না দিলে এবং অশান্তি সৃষ্টি করা হলে পরবর্তীতে সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।”
এদিকে এক আলোচনাসভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। আবারও হল দখলের পাঁয়তারা চলছে। ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেছেন, “‘‘সারা দেশে ধারাবাহিক হামলায় সরকারের উচ্চ মহল থেকে প্রত্যক্ষ উসকানী দেয়া হচ্ছে বলে আমরা স্পষ্ট মনে করি।”
আজ মঙ্গলবার রাতে ছাত্রশিবিরের পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ছাত্রদল-যুবদল ও বিএনপির সন্ত্রাসী হামলা ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে’ এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল বুধবার সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জমায়েতের কর্মসূচি দিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
আজ মঙ্গলবার রাতে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে এক মিছিল শেষে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ।
ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল শেষ হয় জিরো পয়েন্টে। সমাবেশে বক্তারা বলেন, জুলাই এর দুই বছর পার না হতেই বিএনপির কারণে জুলাই চেতনা ধ্বংস হচ্ছে।

রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের পর আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট গ্রুপে মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া শুরু করেন।
তারা এসময় স্লেগান দেয়, “হৈ হৈ রৈ রৈ জামাত শিবির গেলি কয়।”
ছাত্রদল জড়ো শুরু করার ১০ মিনিট আগেই শিবিরের প্রায় ২০ জন নেতাকর্মী একটি মিছিল করে। তারা স্লোগান দেয়, “ আমার সোনার বাংলায়/ সন্ত্রাসীদের ঠাঁই নাই। ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট অ্যাকশন।”
পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদ মিনারে ছাত্রদলের জুলাই অভ্যুত্থানে বার্ষিকী উপলক্ষে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন শুরু হয়।

বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল-যুবদল-বিএনপির ‘হামলার’ প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার রাত ৮টায় বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে এই কর্মসূচি করবে ছাত্রশিবির।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার মো. মাহফুজার রহমান চরচাকে বলেন, “মাদ্রাসার ক্যাম্পাসে এবং হলে ছাত্রদল-শিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিলে এই পরিস্থিতির তৈরি হয়। আমরা এনাফ ফোর্স মোতায়েন করেছি। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করেছি। আশা করছি আর অপ্রীতিকর কিছু ঘটবে না।”
রাজধানীর বকশিবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা এালাকায় বিকেল থেকে মুখোমুখি ছাত্রদল-যুবদল এবং শিবির কর্মীরা। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলার পর এই মুহূর্তে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত রয়েছে। ছাত্রদল-যুবদলের ধাওয়ায় পিছু হটেছে শিবির কর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো এলাকায় জামায়াত-শিবিরবিরোধী মিছিল করছে ছাত্রদল এবং যুবদলের কর্মীরা।