প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের মধ্যে ‘রাজনৈতিক সাহসের অভাব প্রকটভাবে ফুটে’ উঠেছে বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টচার্য।
আজ সোমবার রাজধানীতে নিজেদের কার্যালয়ে ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক সংলাপে সরকারের গত ছয় মাসের কাজের বিশ্লেষণ তুলে ধরে সিপিডি। ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দেবপ্রিয়।
সিপিডি বলছে, রাজনৈতিক সাহসের অভাব ও সিদ্ধান্তহীনতায় দেশের অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধারে যে ধরনের আমূল পরিবর্তন বা ‘বিগ ব্যাং রিফর্ম’ প্রয়োজন ছিল, গত ছয় মাসে তার ঘাটতি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তারা বলছে, আমলাতান্ত্রিক চাপের মুখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার বা ব্যাংকিং বিভাগ পৃথকীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা মিলিয়ে সরকারের কাঠামোকে ‘আড়াই তলা’ উল্লেখ করে বলেন, “সংস্কারের জন্য যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, সেখানে বড় ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুই ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসা এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাংকিং বিভাগকে আলাদা করতে না পারা সরকারের রাজনৈতিক সাহসের অভাব ও আমলাতন্ত্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করা।”
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ নেই এবং এই খাতের সংস্কারগুলো অত্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিপিডির তৈরি করা ‘স্কোরকার্ড’ অনুযায়ী, পর্যালোচিত ৩১টি সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছে, আর উন্নতির দেখা মিলেছে মাত্র ১২টিতে। এই ১২ ক্ষেত্রেও উল্লেখ করার মতো তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবাহ ৪.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি ‘দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি’ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষণে জানানো হয়।
সরকার মূল্যস্ফীতি কমার দাবি করলেও বাস্তবের সাথে তার মিল নেই বলে সিপিডির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। সিপিডি বলছে, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে মজুরি বৃদ্ধির হার (৮ শতাংশ) মূল্যস্ফীতির হারের (৯ শতাংশ) চেয়ে কম, যার অর্থ হলো মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ গত দেড় বছরে ৪৮ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ৫৫ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিপিডি জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা অর্জনে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা প্রায় অসম্ভব। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, কর আহরণের ক্ষেত্রে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বড় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ থেকে কাটছাঁট করতে হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
নীতি নির্ধারণে চরম সমন্বয়হীনতার উদাহরণ হিসেবে সিপিডি বলছে, জুন মাসে মুদ্রানীতিতে সুদের হার না কমানোর কথা বলা হলেও মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে জুলাই মাসে তা কমিয়ে ফেলা হয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সতর্ক করে বলেন, “যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ত্বরান্বিত না হয়, তবে সরকার পুনরায় অতীতের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে; যা দেশের নাগরিকদের অধিকার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।”
সিপিডির এই সংলাপে বক্তারা দ্রুত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতকে একটি বিশেষ ‘সুরক্ষা বলয়ের’ মধ্যে নিয়ে আসা এবং একটি সময়বদ্ধ সংস্কার রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি জানান। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে কি না তা বিশ্লেষণ জরুরি বলেও জানান বক্তারা।