সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা অধরা। পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পিটিআই ও সরকারের মধ্যকার সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।
পিটিআই তাদের প্রতিবাদ মিছিল চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ‘গভর্নরের শাসন’ জারির মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখোয়ার (কেপি) প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেই মিছিল থামানোর চেষ্টা করে। বিরোধী দলের এই মিছিলের আগেই দলীয় কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে শাহবাজ শরিফ সরকার খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেছে—এমন এক পদক্ষেপ যা ওই প্রদেশে জনরোষ উসকে দিতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এটি একটি পরিচিত ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। তবে এবার এর প্রেক্ষাপট হলো ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং খাইবার পাখতুনখোয়া সরকারের মধ্যকার এই বিরোধপূর্ণ অবস্থান সংঘাতময় রাজনীতির এক বিপজ্জনক অধ্যায়কে চিহ্নিত করছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিপরীতে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির অগ্নিঝরা বক্তৃতা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
আলোচনা-পর্যালোচনার সংক্ষিপ্ত বিরতিটুকু বাদ দিলে, বিরোধী দলের প্রতিবাদের জবাবে সরকার তার চিরাচরিত দমন-পীড়ন, হুমকি ও উসকানিমূলক বক্তব্যের পথই বেছে নিয়েছে। তারা খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি এবং প্রদেশটিকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে এবং পদক্ষেপটিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকা হয়েছে।
দমন-পীড়নের সবচেয়ে চরম নিদর্শন হলো পিটিআই-এর আটজনেরও বেশি আইনপ্রণেতাকে (যার মধ্যে জাতীয় পরিষদের তিনজন সদস্যও রয়েছেন) তুলে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আটকে রাখার ঘটনা। বিরোধীদের দমনে বলপ্রয়োগের এই কৌশল সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে, যার ফলে দেশে গণতন্ত্রের অবক্ষয় ঘটেছে। গত কয়েক বছরে বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে নেওয়া নানা পদক্ষেপে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে—যেমন জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা, বিক্ষোভ মিছিল পণ্ড করা, বিরোধী দলের সমর্থকদের গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতে তল্লাশি ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, গণমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি, ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের আরেকটি বড় লক্ষণ হলো বিতর্কিত সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা এবং আদালতের আদেশ অমান্য করা। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কমে যাওয়া স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামোটি টিকে থাকলেও এর ভেতরটা ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ছে।
এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও দেশের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করা। কিন্তু এর ফলে সরকার শক্তিশালী হয় না। বরং এটি আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, দমন-পীড়নের এই পর্যায়ে নতুন কিছু নেই; এটি একটি পরিচিত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং বহু-ব্যবহৃত কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি মাত্র। অতীতে বেসামরিক সরকারগুলোও অগণতান্ত্রিক আচরণ, বিরোধীদের প্রতি অসহিষ্ণুতা, বানোয়াট অভিযোগে প্রতিপক্ষকে কারারুদ্ধ করা, পার্লামেন্টকে গুরুত্বহীন করে ফেলা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। এসব কথাই সত্য। কিন্তু বর্তমান দমনমূলক পদক্ষেপগুলোর ব্যাপকতা ও পরিসর অতীতের যেকোনো বেসামরিক সরকারের আমলের তুলনায় অনেক বেশি।
অভূতপূর্বভাবে জনপরিসরকে সংকুচিত করা হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে—বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে—নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ অনেক বেশি হওয়ায়, বর্তমান সরকার ডিজিটাল পরিসরে বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ আরোপ এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে তাদের পূর্ববর্তী বেসামরিক সরকারগুলোর তুলনায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
এ ধরনের পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এই ‘হাইব্রিড’ সরকারের মুখপাত্ররা দাবি করেন যে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এগুলো জরুরি। কিন্তু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম শান্তভাব কি আদৌ স্থিতিশীলতা আনে? বরং এটি অস্থিরতারই কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জোরজবরদস্তি স্থিতিশীলতা তৈরি করে না; বরং তা মেরুকরণকে গভীর করে, সামাজিক চুক্তিকে দুর্বল করে, দেশকে আরও বিভক্ত করে এবং অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তোলে। বিরোধী দল সমাজের একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে, সংসদে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে এবং তারা কেপি-তে সরকার পরিচালনা করছিল। তাদের দমন ও হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা স্থিতিশীলতা আনে না, বরং রাজনৈতিক সংঘাতের ধারাবাহিকতাকেই নিশ্চিত করে।
অবিরাম রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরকার-বিরোধী দলের সংঘাতের অর্থনৈতিক মাশুল স্পষ্ট। ঘন ঘন ধর্মঘট ও শহর অবরোধের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ নষ্ট হয়। এসব এমন এক সময়ে ঘটছে যখন অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি, প্রবৃদ্ধির গতি অত্যন্ত মন্থর এবং স্থিতিশীলতা এখনো ভঙ্গুর। অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকেন। আইএমএফ-এর কাছ থেকে পাওয়া ঋণের প্রতিটি কিস্তি নিয়ে উৎসব করলেই এই বাস্তবতা আড়াল করা যায় না যে, অর্থনীতি এখনো টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে যাত্রা শুরু করতে পারেনি। এদিকে, গ্যালাপ ও ইপসোস-এর মতো সাম্প্রতিক সব জরিপেই দেখা যাচ্ছে যে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর জনগণের আস্থা কমছে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা হতাশ। স্পষ্টতই, রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বেশ কিছু ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা ও পারস্পরিক সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করে একটি শান্তিপূর্ণ ও পূর্বাভাসযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। বিভক্ত ও মেরুকৃত কোনো দেশ স্থিতিশীল হতে পারে না। এমন একটি প্রকৃত সংলাপ প্রয়োজন যার লক্ষ্য হবে দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতা বা সহাবস্থান নিশ্চিত করা—না কি কেবল পরবর্তী বিক্ষোভ মিছিল ঠেকানোর মতো স্বল্পমেয়াদী কোনো কৌশল। এর অর্থ হলো, আদালতের আদেশ অমান্য করে পিটিআই নেতা ইমরান খানের প্রতি যে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে, তা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো শুরুতেই ভেস্তে গিয়েছিল, কারণ সরকার বিরোধী দলীয় নেতাদের আলোচনার বিষয়ে পরামর্শের জন্য ইমরানের সাথে দেখা করার অনুমতি দিতেও রাজি ছিল না। এছাড়া, আইন অনুযায়ী তার প্রাপ্য অধিকারটুকু দিতেও সরকার অনিচ্ছুক। এ ধরনের মনোভাব কোনো অর্থবহ আলোচনার ভিত্তি হতে পারে না, রাজনৈতিক সমঝোতার কথা তো দূরে থাক।
নির্বাচনী ও জনসমর্থনপুষ্ট অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ না দিয়ে বরং ঐকমত্যের ভিত্তিতে ও সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব। পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে ‘বিজয়ীই সব ক্ষমতার অধিকারী’—এমন এক মানসিকতা বা পদ্ধতির প্রাধান্য দেখা গেছে। এই প্রবণতাটি একটি ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে: যে দল নির্বাচনে জয়ী হয় (যা প্রায়শই মোট ভোটের সংখ্যালঘু অংশ পেয়ে এবং বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটে থাকে), তারাই নাকি জনগণের ‘একমাত্র প্রতিনিধি’। এই অবস্থানটি এমন এক শাসনব্যবস্থার জন্ম দেয় যা স্বভাবগতভাবেই অস্থিতিশীল ও বর্জনমূলক। একতরফা শাসন কেবল গণতন্ত্রকেই ক্ষুণ্ণ করে না, বরং কার্যকর শাসনব্যবস্থাকেও দুর্বল করে তোলে। দেশটির ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কারণে সর্বজনীন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা অপরিহার্য। কেন্দ্রীয় সরকারকে অবশ্যই বিরোধী দল-শাসিত প্রদেশগুলোর সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নয়।
আইনের শাসন বজায় থাকে—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা; ক্ষণস্থায়ী ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার লোভে সেগুলোকে দুর্বল করা নয়। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের ধারাবাহিকতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করে, যা স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং মৌলিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থাও এই প্রতিষ্ঠানগুলোই নিশ্চিত করে।
যারা মনে করেন যে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়ে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব, তাদের জন্য পাকিস্তানের ইতিহাসই প্রমাণস্বরূপ যে—দেশ ও জনগণের জন্য সেই পথটি কতটা বিপর্যয়কর ছিল।
মালিহা লোধি: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত
(এই লেখাটি পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন–এর সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)