ধরাছোঁয়ার বাইরে জেল পালানো ৭১৬ জন

ধরাছোঁয়ার বাইরে জেল পালানো ৭১৬ জন
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারা দেশের আটটি কারাগার বিদ্রোহীদের হাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার, নরসিংদী, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও শেরপুর জেলা কারাগার। ছবি: চরচা

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালে দেশের ১৭টি কারাগারে বন্দীদের নজিরবিহীন বিদ্রোহ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দুটি কারাগারের সব বন্দীসহ পাঁচটি জেলখানা থেকে দুই হাজার ২৪৭ জন বন্দী ওই সময় পালিয়ে যায়।

পরে বিভিন্ন সময় আত্মসমর্পণ এবং অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় এক হাজার ২৪৭ জন বন্দীকে। তবে ঘটনার দেড় বছর পর এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে ৭১৬ বন্দী । ওই সময় কারা বিদ্রোহ ঠেকাতে দুটি কারাগারের রক্ষীদের গুলিতে মারা যান ১৩ বন্দী। আর কারারক্ষীসহ আড়াইশোর বেশি মানুষ আহত হন। কারা সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কারাগার থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

পলাতক বন্দীদের হদিশ না পাওয়ার জন্য তথ্য সংরক্ষণ না করাই দায়ী। কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে বন্দীদের তথ্য রাখার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

গত বছর কারা অধিদপ্তরের এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেন জানিয়েছিলেন, কারাগারগুলো থেকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন, বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত বন্দীসহ বিচারাধীন দুই হাজার ২৪৭ জন বন্দী পালিয়ে যান। যার মধ্যে ১৫০০ জনকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এখনো ৭১৬ জন পলাতক। এদের মধ্যে মধ্যে ১১ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী, ৭০ জন জঙ্গি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আছেন।

ওই সময় নরসিংদী ও শেরপুর কারাগার থেকে বন্দী পালানোর পাশাপাশি রাইফেল, শটগান ও মেশিন গানসহ ৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৯ হাজার গোলাবারুদ লুট করা হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৬৫টি অস্ত্র উদ্ধার করা গেলেও এখনো ২৭টি চাইনিজ রাইফেল ও ছয় হাজারের বেশি গোলাবারুদ অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে।

প্রথম ঘটনা

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই প্রথম ঘটনা ঘটে নরসিংদী জেলা কারাগারে। সেদিন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী কারাগারে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। সেই সুযোগে কারাগারে থাকা ৯ জঙ্গিসহ ৮২৬ জন বন্দীই পালিয়ে যান। এরমধ্যে চারজন রাজধানীর হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। ওই সময় কারাগারের বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের পাশাপাশি ৮৫টি অস্ত্র ও আট হাজারের বেশি গোলাবারুদ লুট করা হয়।

এরপর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন জেলার অন্তত ১৭টি কারাগারে একযোগে হামলা, বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। সেই সময় বন্দী বিদ্রোহ ঠেকাতে জামালপুর ও গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন ১৩ জন বন্দী।

কারা সূত্রগুলো বলছে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নরসিংদী কারাগার ছাড়াও ১৬টি কারাগারে বন্দীরা বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ করেছিলেন। এরমধ্যে নরসিংদী ও শেরপুর কারাগারের সব বন্দীসহ পাঁচটি কারাগার থেকে মোট দুই হাজার ২৪৭ জন বন্দী পালিয়ে যান। একইসঙ্গে ওইসব কারাগার থেকে লুট করা হয় অস্ত্র, গুলি, গোলাবারুদ, চাল-ডাল এমনকি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও। শেরপুর ও নরসিংদী কারাগারের সব নথি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে এই দুই কারাগারের বন্দীদের তথ্য নেই কারা কর্তৃপক্ষের কাছে। যদিও পরে পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের নামে থাকা মামলা ও আদালত সূত্রে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নরসিংদী জেলা কারাগারের জেলার (ভারপ্রাপ্ত) হুমুয়ান কবীর বলেন, “কারাগারে থাকা ৮২৬ জন পালিয়ে যান। পরে আত্মসমর্পণ করেন ৬৪৬ জন এবং গ্রেপ্তার করা হয় ৩৮ জনকে। এখনো ১৪২ জন পলাতক। তখন কারাগার থেকে আট হাজার ১৫টি গুলি ও গোলাবারুদ লুট হয়, যা পরবর্তী সময়ে এক হাজার ৬৮০টি উদ্ধার করা হয়েছে।”

সাতক্ষীরা কারাগারের ডেপুটি জেলার মো. মনির হোসেন বলেন, “২০২৪ সালে সরকার পতনের পর সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে ৫৯৬ জন বন্দী পালিয়ে যায়। তবে পরে তাদের মধ্যে ৫০৯ জন আত্মসমর্পণ করেন এবং ৪৪ জন বন্দীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো ৪৩ জন পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ১২ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামি।”

কারা সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সকালে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এসময় তারা জেলের ভেতরে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। ৭ ও ৮ আগস্ট বন্দীরা দেয়াল টপকে পালাতে গিয়ে কারারক্ষীদের গুলিতে ছয়জন নিহত হন। এরপরও সেখান থেকে ৮৮ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিসহ ২০২ জন বন্দী পালিয়ে যান। এরমধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনো পলাতক রয়েছেন ১৪১ জন, যাদের মধ্যে ৪৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত।

কুষ্টিয়া কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, “কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ জন বন্দী পালিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন সময় আত্মসমর্পণ ও গ্রেপ্তার করা হয় ৮৯ জনকে। এখনো পলাতক রয়েছেন ১৬ জন বন্দী। এরমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন তিনজন।”

শেরপুর জেলা কারাগারের জেলার (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ আবদুস সেলিম বলেন, “৫ আগস্ট বিকেলে প্রধান ফটক ভেঙে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে দুর্বৃত্তরা। এ সুযোগে জেলে থাকা ৫১৮ বন্দী পালিয়ে যান। পরে ১৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে পুলিশ। ওই সময় কারাগার থেকে যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করা হয়েছি, কিছু গুলি ছাড়া সব উদ্ধার করা হয়েছে।”

কারা সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সারা দেশের আটটি কারাগার বিদ্রোহীদের হাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার, নরসিংদী, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা ও শেরপুর জেলা কারাগার।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত উল ফরহাদ বলেন, “পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এক হাজার ৫৩১ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আনা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।”

কারাগার থেকে পালানোর চিত্র

কারাগার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি

কারা অধিদপ্তর জানায়, বিগত সময়ে কারাগারগুলোতে বন্দীদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। কিন্তু কোনো সেন্ট্রাল সার্ভার ছিল না। ফলে কারাগারের নথিপত্র পুড়ে যাওয়ায় অনেক বন্দীর পরিচয় নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুটি কারাগারে বন্দীদের কোনো তথ্য নেই উল্লেখ করে মো. জান্নাত উল ফরহাদ বলেন, “আমাদের প্রতিটি কারাগারে নিজস্বভাবে বন্দীদের তথ্য রাখা হতো। ওই সময় কারাগারগুলোতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের কারণে দুটি কারাগারের নথিপত্র সব পুড়ে গেছে। তবে বিভিন্ন মামলা থেকে পালিয়ে যাওয়ার বন্দীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে কারাগারগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য সংরক্ষণে এনটিএমসি সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।”

পালাতকদের মধ্যে কারা রয়েছেন

পাঁচটি কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের মধ্যে এখনো হদিস মেলেনি ৭১৬ জনের। এরমধ্যে জঙ্গিসহ ৯৯ জন সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ৮৪ জন। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে চারজন মৃত্যুদণ্ডসহ ৯ জন সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে। এছাড়া পলাতকদের মধ্যে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বিচারাধীন ছিলেন ৭০ জন।

লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ নিরাপত্তার জন্য হুমকি

বিদ্রোহের সময় নরসিংদী ও শেরপুর কারাগার থেকে লুট হয় বিভিন্ন ধরনের ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় ৯ হাজারের বেশি গোলাবারুদ। শুধুমাত্র নরসিংদী কারাগার থেকে লুট করা হয় ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও আট হাজারের বেশি গোলাবারুদ। গত দেড় বছরে বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এখনো ৬৫টি অস্ত্র এবং প্রায় দুই হাজার ৮২৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো ২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ছয় হাজারে বেশি গোলাবারুদের কোনো হদিস নেই, যা নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নিরাপত্তা জোরদার ও নতুন উদ্যোগ

কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে কারাগারের সীমানাপ্রাচীর উঁচু করার পাশাপাশি বন্দিদের ছবি ও আঙুলের ছাপ দিয়ে ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি কারাগারে আলাদা এনটিএমসি সিস্টেম চালু হচ্ছে, যাতে তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

সম্পর্কিত