বাংলাদেশের পতাকা থেকে মানচিত্র বাদ পড়েছিল কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশের পতাকা থেকে মানচিত্র বাদ পড়েছিল কেন?
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

১৯৭১ সালের ২ মার্চ বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। এদিন প্রথমবার বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল, যা বিশ্ববাসীকে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের এক স্পষ্ট বার্তা দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ঐতিহাসিক বটতলায় এক বিশাল ছাত্র সমাবেশে এই পতাকা প্রথম ওড়ানো হয়। গাঢ় সবুজ পটভূমির ওপর লাল বৃত্তের মাঝে তৎকালীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত সেই পতাকাটি কলা ভবনের ছাদে উত্তোলন করা হয়। শত শত বিক্ষুব্ধ ছাত্র ও সাধারণ মানুষের গগণবিদারী উল্লাসে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।

ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আ স ম আবদুর রব এই পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শাহজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকীর মতো তুখোড় ছাত্র নেতারা।

সমাবেশের শুরুতে শিক্ষার্থীরা যেকোনো আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেন। সমাবেশ শেষে একটি বিশাল মিছিল বের করা হয় যা বায়তুল মোকাররম এলাকায় গিয়ে শেষ হয়েছিল। সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয় এলাকা থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলে নতুন পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তানি শাসকরা হঠাৎ কারফিউ জারি করলেও জনতা তা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। ‘সান্ধ্য আইন মানি না’, ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’- এমন সব স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে ডিআইটি মোড়ে মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে এবং গভর্নর হাউসের দিকে এগোতে থাকা মিছিলে সেনাবাহিনী গুলি চালালে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৩ মার্চ থেকে টানা চার দিন প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সারা দেশে হরতাল ঘোষণা করা হয়। 

২ মার্চের সেই উত্তাল দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আ স ম আবদুর রব জানিয়েছিলেন, সমাবেশটি বটতলায় হলেও পতাকাটি তিনি উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন কলা ভবন ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের ছাদে, যাতে সেটি সবার দৃষ্টিগোচর হয়। ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

পরবর্তীতে ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে জয় বাংলা বাহিনী পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে তার পরিবর্তে এই লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করে। এরপর পতাকাটি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তিনি নিজ হাতে সেটি সেখানে উত্তোলন করেন। প্রথম পতাকার নকশা করেছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা শিব নারায়ণ দাস। ওই পতাকার মাঝে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। 

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম ১০ চরণকে জাতীয় সংগীত এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানটিকে রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

সেখানেই পতাকার মাঝখান থেকে মানচিত্রটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং পটুয়া কামরুল হাসান জাতীয় পতাকাকে বর্তমান রূপ দেন। অবশেষে ৪ নভেম্বর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণের সময় সবুজ জমিনে লাল বৃত্তের এই পতাকাটিকেই দাপ্তরিকভাবে জাতীয় পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

সম্পর্কিত