সোহরাব হাসান

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নন্দিত শিক্ষক, রাষ্ট্র তাকে প্রফেসর অ্যামেরিটাস পদে অভিষিক্ত করেছে, লেখক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি পেয়েছেন, একের পর এক পত্রিকা ও সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু এসবে তার পুরো পরিচয় উঠে আসে না।
দীর্ঘ জীবনসাধনায় তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর, ও মানবমুক্তির আন্দোলনের উজ্জ্বল বাতিঘর। তার কাছে তরুণেরা গিয়ে ভরসা পান, প্রবীণেরা অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
আমরা বলছি, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথা। শিল্পসাহিত্যের সব শাখায় তার বিরামহীন পদচারণা। কেউ শুনুক বা না শুনুক, তিনি বলে যাচ্ছেন। লিখে যাচ্ছেন। এই বলা বা লেখাকে তিনি কেবল লেখকের দায়িত্ব কিংবা পেশাগত কর্তব্য ভাবেন না, জীবন সাধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনদর্শন হলো জনগণের কল্যাণ ও মুক্তি। তিনি মনে করেন, সেই মুক্তি তখনই আসতে পারে, যখন সমাজে শোষণ বঞ্চনা থাকবে না। ব্যক্তি মালিকানা উচ্ছেদ করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সামন্তীয় ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পাশাপাশি তিনি পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধেও কলম ধরেছেন। আমরা দু দুবার স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু সমষ্টিগত মানুষকে স্বাধীন করেনি এবং দেয়নি মুক্তিও।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে বামপন্থী তথা কমিউনিস্টরা জোরালো ভূমিকা রেখেছে। অখণ্ড স্বাধীন ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের লক্ষ্য। দেশমুক্তির আন্দোলন ও শ্রেণিসংগ্রাম একসঙ্গেই চলছিল। বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত হচ্ছিল বিদ্রোহ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিভেদাত্মক রাজনীতি দেশভাগকে অনিবার্য করে তোলে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইতে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এই লেখককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ক্ষমতার ভাগাভাগিতে লিপ্ত না হয়ে বৃহত্তর জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করলে দেশভাগ এড়ানো যেত।
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ২৩ বছরের গণসংগ্রাম ও ৯ মাসের গণযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, যার অন্যতম লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সেক্যুলারিজম। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার অবসান হয়নি। সেক্যুলারিজম এর বাংলা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, ইহজাগতিকতা। আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথাটি স্পষ্ট করে বলেছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমরা শব্দের অর্থে আপস করতে গিয়ে পুরো রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। এখন ইহজাগতিকতা শব্দটি বলাও গর্হিত অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও সমাজে সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, কেবল উপমহাদেশ নয়, বিশ্বে যত যুদ্ধ হানাহানি, বৈষম্য ও শোষণ এর পেছনে আছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। পুঁজিবাদের নিগড় ভাঙতে দেশে দেশে যত সংগ্রাম হয়েছে, যত আন্দোলন হয়েছে, এখনো হচ্ছে–তিনি এর প্রতিটিকে নিজের আন্দোলন মনে করেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষাবিদ ও লেখক। এ জন্য ভাষাকেই সংগ্রামের হাতিয়ার করেছেন, পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তার হাত ধরে অনেক লেখক তৈরি হয়েছেন। ক্ষীণায়ু পত্রিকার যুগে প্রায় আড়াই দশক ধরে তিনি নতুন দিগন্ত সম্পাদনা করে এসেছেন বিরতিহীনভাবে। অভিন্ন পথের যাত্রীদের একত্র করতে সচেষ্ট থেকেছেন সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্রকে মাধ্যম করে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে দেশের মুক্তির চেয়েও তার কাছে বড় হলো মানুষের মুক্তি।

আমাদের সমাজে তরুণ বয়সে অনেকেই সমাজবাদে দীক্ষা নেন, আন্দোলন করেন, জেল খাটেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগকে পরিণত বয়সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তথা ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দের কাছে তাদের আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। তরুণ বয়সে তিনি সেই অর্থে বামপন্থী ছিলেন না। গেল শতকের ষাটের দশকে যুক্তরাজ্যের লিডসে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার সময় বামপন্থায় আকৃষ্ট হন। সেই থেকে বামপন্থাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দিশা বলে মনে করে আসছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চাইলে যে কোনো উন্নত দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে পারতেন। দেশের ভেতরেও সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ অলঙ্কৃত করতে পারতেন। সেই সুযোগও এসেছিল। কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে সমাজে নিরন্তর আলো জ্বালার কাজটি করে গেছেন এবং এখনো করছেন।
ইংরেজি সাহিত্যের নাম করা শিক্ষক হয়েও প্রধানত বাংলা ভাষায় লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এর উদ্দেশ্য ছিল অধিক সংখ্যক পাঠকের কাছে যাওয়া। তিনি সফলও হয়েছেন।
বাংলাদেশে প্রবন্ধ সাহিত্য মানেই সাধারণ পাঠকের কাছে অবোধ্য ভাষা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গল্পের মতো করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন নানা তথ্য উপাত্ত সহযোগে। এ কারণে তার প্রবন্ধের বইগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সারা জীবনের সাধনা হলো, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে একলা চলরে।” তবে তিনি একলা চলেননি। তার চলার পথে আরও অনেককে সহযাত্রী করেছেন। তিনি জানেন, কাজ করলে সমালোচনা হবে, কিন্তু তাই বলে থামলে চলবে না।
বামপন্থী ধ্যানধারনায় বিশ্বাসী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কখনো জাতীয়তাবাদের গুরুত্বকে অগ্রাহ্য করেননি। তার মতে, একাত্তর পর্যন্ত জাতীয়তাবাদীরা তাদের ভূমিকা পালন করেছেন। এরপর তাদের নতুন কিছু দেওয়ার নেই। নতুন দায়িত্বটা নিতে হবে বামপন্থীদেরই। কিন্তু বিভক্তি ও বিভ্রান্তির কারণে সেটা তারা করতে পারেননি।
প্রতিটি গণআন্দোলন ও অভ্যুত্থানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ দিয়েছেন, তেমনি সভামঞ্চেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। আশির দশকে এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম করে বাংলাদেশের ভাবাদর্শ বদলে দিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে যে কজন লেখক-বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদ করেছিলেন, আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও ছিলেন। একই ভাবে নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারই শিক্ষক ও সহকর্মীদের যে আল-বদর ও রাজাকারেরা যে খুন করেছে, সে কথা তার লেখায় বারবার এসেছে।
সামাজিক আন্দোলনেও তাকে আমরা অগ্রসারিতে পেয়েছি। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে ওসমানী উদ্যানের গাছ কেটে সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে একদল তরুণকে নিয়ে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে শেরে বাংলা নগরে এটি স্থানান্তিরত হয়। আমাদের রাজনীতিকেরা কতটা অপরিণামদর্শী সেটা এই একটি ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হয়। সেদিন আন্দোলন করে ওসমানী উদ্যানে সম্মেলন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বন্ধ না করলে কী পরিস্থিতি হতো? আওয়ামী লীগ সরকার তার জন্মস্থান বিক্রমপুরের আড়িয়াল বিল দখল করে বিমানবন্দর করতে চাইলে তার বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছিলেন এই প্রবীন শিক্ষাবিদ। এ জন্য তাকে মামলার শিকারও হতে হয়েছিল। এ ছাড়া মত প্রকাশের জন্যও তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল তৎকালীন সরকার।
বামপন্থার যখন ক্ষয়িষ্ণু দশা তখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে বাম প্রগিতশীলদের একত্র করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একত্র করেও ছিলেন। কিন্তু তারপরও বামপন্থীরা এর ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি। এমনকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের সুফল যাতে ডানপন্থীরা ছিনতাই করে নিতে না পারে, সে জন্য ফের বামদের নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলেও সেটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেনি। তার আগেই বামেরা আরও বিভক্ত হয়েছে, আরও বিভ্রান্তির চোরাগলিতে চলে গেছে।
তারপরও তিনি হতাশ হননি। অবিরাম লিখে চলেছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নির্মম শোষণ ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে। নিজের লেখার পাশাপাশি তরুণদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন। কেননা তিনি জানেন এই তরুণেরা বাংলাদেশের ভবিষ্যত।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৯১তম জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নন্দিত শিক্ষক, রাষ্ট্র তাকে প্রফেসর অ্যামেরিটাস পদে অভিষিক্ত করেছে, লেখক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি পেয়েছেন, একের পর এক পত্রিকা ও সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। কিন্তু এসবে তার পুরো পরিচয় উঠে আসে না।
দীর্ঘ জীবনসাধনায় তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর, ও মানবমুক্তির আন্দোলনের উজ্জ্বল বাতিঘর। তার কাছে তরুণেরা গিয়ে ভরসা পান, প্রবীণেরা অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
আমরা বলছি, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথা। শিল্পসাহিত্যের সব শাখায় তার বিরামহীন পদচারণা। কেউ শুনুক বা না শুনুক, তিনি বলে যাচ্ছেন। লিখে যাচ্ছেন। এই বলা বা লেখাকে তিনি কেবল লেখকের দায়িত্ব কিংবা পেশাগত কর্তব্য ভাবেন না, জীবন সাধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনদর্শন হলো জনগণের কল্যাণ ও মুক্তি। তিনি মনে করেন, সেই মুক্তি তখনই আসতে পারে, যখন সমাজে শোষণ বঞ্চনা থাকবে না। ব্যক্তি মালিকানা উচ্ছেদ করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সামন্তীয় ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পাশাপাশি তিনি পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধেও কলম ধরেছেন। আমরা দু দুবার স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু সমষ্টিগত মানুষকে স্বাধীন করেনি এবং দেয়নি মুক্তিও।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে বামপন্থী তথা কমিউনিস্টরা জোরালো ভূমিকা রেখেছে। অখণ্ড স্বাধীন ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের লক্ষ্য। দেশমুক্তির আন্দোলন ও শ্রেণিসংগ্রাম একসঙ্গেই চলছিল। বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত হচ্ছিল বিদ্রোহ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের ‘ভাগ করো ও শাসন করো’ নীতি এবং কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিভেদাত্মক রাজনীতি দেশভাগকে অনিবার্য করে তোলে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইতে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এই লেখককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ক্ষমতার ভাগাভাগিতে লিপ্ত না হয়ে বৃহত্তর জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করলে দেশভাগ এড়ানো যেত।
সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ২৩ বছরের গণসংগ্রাম ও ৯ মাসের গণযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, যার অন্যতম লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল সেক্যুলারিজম। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার অবসান হয়নি। সেক্যুলারিজম এর বাংলা ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, ইহজাগতিকতা। আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথাটি স্পষ্ট করে বলেছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমরা শব্দের অর্থে আপস করতে গিয়ে পুরো রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গে আপস করে ফেলেছি। এখন ইহজাগতিকতা শব্দটি বলাও গর্হিত অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ও সমাজে সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, কেবল উপমহাদেশ নয়, বিশ্বে যত যুদ্ধ হানাহানি, বৈষম্য ও শোষণ এর পেছনে আছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। পুঁজিবাদের নিগড় ভাঙতে দেশে দেশে যত সংগ্রাম হয়েছে, যত আন্দোলন হয়েছে, এখনো হচ্ছে–তিনি এর প্রতিটিকে নিজের আন্দোলন মনে করেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষাবিদ ও লেখক। এ জন্য ভাষাকেই সংগ্রামের হাতিয়ার করেছেন, পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তার হাত ধরে অনেক লেখক তৈরি হয়েছেন। ক্ষীণায়ু পত্রিকার যুগে প্রায় আড়াই দশক ধরে তিনি নতুন দিগন্ত সম্পাদনা করে এসেছেন বিরতিহীনভাবে। অভিন্ন পথের যাত্রীদের একত্র করতে সচেষ্ট থেকেছেন সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্রকে মাধ্যম করে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে দেশের মুক্তির চেয়েও তার কাছে বড় হলো মানুষের মুক্তি।

আমাদের সমাজে তরুণ বয়সে অনেকেই সমাজবাদে দীক্ষা নেন, আন্দোলন করেন, জেল খাটেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগকে পরিণত বয়সে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তথা ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দের কাছে তাদের আত্মসমর্পণ করতে দেখা যায়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। তরুণ বয়সে তিনি সেই অর্থে বামপন্থী ছিলেন না। গেল শতকের ষাটের দশকে যুক্তরাজ্যের লিডসে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার সময় বামপন্থায় আকৃষ্ট হন। সেই থেকে বামপন্থাকে সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দিশা বলে মনে করে আসছেন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী চাইলে যে কোনো উন্নত দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে পারতেন। দেশের ভেতরেও সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ অলঙ্কৃত করতে পারতেন। সেই সুযোগও এসেছিল। কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে সমাজে নিরন্তর আলো জ্বালার কাজটি করে গেছেন এবং এখনো করছেন।
ইংরেজি সাহিত্যের নাম করা শিক্ষক হয়েও প্রধানত বাংলা ভাষায় লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এর উদ্দেশ্য ছিল অধিক সংখ্যক পাঠকের কাছে যাওয়া। তিনি সফলও হয়েছেন।
বাংলাদেশে প্রবন্ধ সাহিত্য মানেই সাধারণ পাঠকের কাছে অবোধ্য ভাষা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গল্পের মতো করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন নানা তথ্য উপাত্ত সহযোগে। এ কারণে তার প্রবন্ধের বইগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সারা জীবনের সাধনা হলো, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে একলা চলরে।” তবে তিনি একলা চলেননি। তার চলার পথে আরও অনেককে সহযাত্রী করেছেন। তিনি জানেন, কাজ করলে সমালোচনা হবে, কিন্তু তাই বলে থামলে চলবে না।
বামপন্থী ধ্যানধারনায় বিশ্বাসী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কখনো জাতীয়তাবাদের গুরুত্বকে অগ্রাহ্য করেননি। তার মতে, একাত্তর পর্যন্ত জাতীয়তাবাদীরা তাদের ভূমিকা পালন করেছেন। এরপর তাদের নতুন কিছু দেওয়ার নেই। নতুন দায়িত্বটা নিতে হবে বামপন্থীদেরই। কিন্তু বিভক্তি ও বিভ্রান্তির কারণে সেটা তারা করতে পারেননি।
প্রতিটি গণআন্দোলন ও অভ্যুত্থানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ দিয়েছেন, তেমনি সভামঞ্চেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছেন। আশির দশকে এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম করে বাংলাদেশের ভাবাদর্শ বদলে দিয়েছেন। এর বিরুদ্ধে যে কজন লেখক-বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদ করেছিলেন, আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও ছিলেন। একই ভাবে নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারই শিক্ষক ও সহকর্মীদের যে আল-বদর ও রাজাকারেরা যে খুন করেছে, সে কথা তার লেখায় বারবার এসেছে।
সামাজিক আন্দোলনেও তাকে আমরা অগ্রসারিতে পেয়েছি। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে ওসমানী উদ্যানের গাছ কেটে সরকার কর্তৃক আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে একদল তরুণকে নিয়ে তিনি আন্দোলন গড়ে তোলেন। সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে শেরে বাংলা নগরে এটি স্থানান্তিরত হয়। আমাদের রাজনীতিকেরা কতটা অপরিণামদর্শী সেটা এই একটি ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হয়। সেদিন আন্দোলন করে ওসমানী উদ্যানে সম্মেলন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বন্ধ না করলে কী পরিস্থিতি হতো? আওয়ামী লীগ সরকার তার জন্মস্থান বিক্রমপুরের আড়িয়াল বিল দখল করে বিমানবন্দর করতে চাইলে তার বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছিলেন এই প্রবীন শিক্ষাবিদ। এ জন্য তাকে মামলার শিকারও হতে হয়েছিল। এ ছাড়া মত প্রকাশের জন্যও তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল তৎকালীন সরকার।
বামপন্থার যখন ক্ষয়িষ্ণু দশা তখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে বাম প্রগিতশীলদের একত্র করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একত্র করেও ছিলেন। কিন্তু তারপরও বামপন্থীরা এর ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি। এমনকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের সুফল যাতে ডানপন্থীরা ছিনতাই করে নিতে না পারে, সে জন্য ফের বামদের নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলেও সেটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেনি। তার আগেই বামেরা আরও বিভক্ত হয়েছে, আরও বিভ্রান্তির চোরাগলিতে চলে গেছে।
তারপরও তিনি হতাশ হননি। অবিরাম লিখে চলেছেন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নির্মম শোষণ ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে। নিজের লেখার পাশাপাশি তরুণদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন। কেননা তিনি জানেন এই তরুণেরা বাংলাদেশের ভবিষ্যত।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৯১তম জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।