আরমান ভূঁইয়া

মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি কোনো কাজে দিচ্ছে না। ঈদযাত্রায় বাড়তি ভাড়া দিয়েই রাজধানী ছাড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। আনন্দের যাত্রায় শুধু অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অতিরিক্ত খরচের চাপ।
এবার ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে গত ১৭ মার্চ থেকে। আজ বৃহস্পতিবারও ঢাকা থেকে দেশের নানা প্রান্তে ছুটছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদযাত্রার শুরু থেকেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত আদায় বন্ধে কড়াকড়ির ঘোষণা দেওয়া হয়।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও বিভিন্ন টার্মিনাল পরিদর্শন করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টদের। তবে বাস্তবে অতিরিক্ত ভাড়া এবং বাস ছাড়তে দেরি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
মন্ত্রী রবিউল আলমের গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, “সবাই নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছে। বরং দুয়েকটি পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০-৩০ টাকা কম নিচ্ছে, যা যাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক।”
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, এবার ঈদে ভাড়া নৈরাজ্য অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বলেছেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যাত্রীরা বলছেন, নির্ধারিত ভাড়া নিশ্চিত করা এবং সময়মতো বাস ছাড়ার বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারকি না করলে ঈদযাত্রার ভোগান্তি কমবে না।

আজ বৃহস্পতিবার গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে অনেক যাত্রী বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বাস ছাড়ছে না। কখন বাস আসবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যও দিতে পারছেন না কাউন্টারে দায়িত্বরতরা।
ভাড়া যে বেশি নেওয়া হচ্ছে তা সরকারের এক তথ্য বিবরণীতেও উঠে এসেছে। এর দায়ে জরিমানা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
নেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে জামালপুরের সানন্দবাড়ীর যাত্রী রাকিব হাসানের অভিযোগ, একতা পরিবহনের ৫০০ টাকার ভাড়া তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৭০০ টাকা। একইভাবে মৌলভীবাজারগামী রাজু আহমেদ বলেন, বিলাস পরিবহনের ৫৫০ টাকার ভাড়া তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৭০০ টাকা। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বিলাস পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মিজান দাবি করেন, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে না।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী নিলুফার ইয়াসমিন স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রংপুরের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। চরচাকে তিনি বলেন, “এনা ট্রান্সপোর্টে এক হাজার ৫০ টাকার ভাড়ার জায়গায় এক হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর চেয়েও বড় সমস্যা, দুপুর ১টায় বাস ছাড়ার কথা থাকলেও বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাস আসেনি। পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাস যানজটে আটকে আছে এবং আরও ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
নাটোরের বাসের জন্য অপেক্ষারত মো. মাসুদুর রহমান অভিযোগ করেন, ৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এরপর ৩-৪ ঘণ্টা ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এনা ট্রান্সপোর্টের কাউন্টার মাস্টার অর্জুন বলেন, “সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে না। অনেক সময় নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট না থাকায় যাত্রীরা অন্য রুটের টিকিট নিচ্ছেন, ফলে ভাড়া বেশি মনে হচ্ছে।” বাস বিলম্বের কারণ হিসেবে তিনি সড়কে যানজটের কথা উল্লেখ করেন।

মহাখালীতে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত মনিটরিং করলেও বাড়তি ভাড়া আদায় থামছে না।
‘টিকিট নেই, তাই ভাড়া বেশি’
একতা ট্রান্সপোর্টের যাত্রী শামীমা আক্তার অভিযোগ করেন, বগুড়ার নিয়মিত ভাড়া ৫৫০ টাকা হলেও ঈদ উপলক্ষে ৬৯০ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই পরিবহন থেকে রংপুরগামী জুঁই বলেন, প্রতিটি টিকিটে ২০০ টাকা করে বেশি নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে একতা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হাসনাত বলেন, “অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট না থাকায় কাছাকাছি অন্য গন্তব্যের টিকিট দেওয়া হচ্ছে, ফলে ভাড়া কিছুটা বেশি হচ্ছে।”
গাবতলী বাস টার্মিনালের চিত্র
গাবতলী যাত্রীদের চাপ কম থাকলেও, সব গন্তব্যে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
গাবতলী থেকে মাগুরার ভাড়া ৫০০ টাকা, তবে ঈদের আগে এই গন্তব্যের টিকিট ৮০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন ইমরান হোসেন। শুধু তিনি একা নন, এই আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার ভাড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি বেড়েছে। যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হলেও দেখার কেউ নেই। যাত্রীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ভিজিলেন্স টিম থাকলেও, তাদের বিরুদ্ধে বসে সময় কাটানোর অভিযোগ অনেকের।
গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, দূরপাল্লার বেশির ভাগ বাসের টিকিট কাউন্টার ফাঁকা ও যাত্রীদের ভিড় কম। তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাস কনডাক্টররা ডেকে যাত্রীদের আকর্ষণ করছেন। অনেক বাসের টিকিট টার্মিনালের ভিতরে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকা থেকে রাজবাড়ীর ভাড়া ৩৯০ টাকার জায়গায় এখন ৫০০, ফরিদপুরে ৪০০ টাকা হলেও এখন ৬০০, নাটোরের ভাড়া ৬০০ টাকা হলেও এখন ৮০০, যশোরের ভাড়া ৬৫০ হলেও এখন এক হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বগুড়া, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার স্বাভাবিক সময়ের ভাড়ার চেয়ে ২০০ টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
গাবতলী টার্মিনালে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তবে সবার সামনে বাড়তি ভাড়া নিলেও যাত্রীদের অভিযোগ, তাদের দেখার কেউ নেই। একদিকে যাত্রীরা আগাম টিকিট না পেয়ে দায়ে পড়েই বেশি ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। ভিজিলেন্স টিম নামমাত্র টহল দিয়ে বেশিরভাগ সময় অস্থায়ী বুথে বসে সময় কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
ভিজিলেন্স টিমের এক সদস্য জানান, গত তিন দিনে তারা ৩০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছে, যেগুলোর সমাধান করা হয়েছে।

আল আমিন হোসেন নামের একজন যাত্রী বলেন, “সৌহার্দ্য পরিবহন রাজবাড়ির ভাড়া নিচ্ছে ৬০০ টাকা। এই রুটে বাসের ভাড়া ৪০০ টাকা।”
মিনারুল নামের একজন যাত্রী বলেন, “আমি ফরিদপুর যাব। আগে টিকিট কাটতে পারিনি। এই রুটের ভাড়া সাড়ে তিনশ টাকা হলেও তারা ৬০০ নিয়েছে। বাড়ি যেতে হবে তাই বাধ্য হয়ে টিকিট নিলাম।”
ফজলুল হক নামের একজন যাত্রী বলেন, “বাস ছাড়া সময় ছিল দেড়টায়। তবে কাউন্টার গিয়ে শুনি গাড়ির সমস্যা হয়েছে। বাস আসতে তিনটা বেজে যাবে।”
রবিউল নামের একজন যাত্রী বলেন, “আমি ফরিদপুর যাব। বাসের লোকজন ডেকে ডেকে যাত্রী নিচ্ছে বেশি ভাড়ায় কিন্তু প্রশাসনের কেউ দেখার নাই। সবাই নিজেদের অস্থায়ী বুথেই সময় কাটান। মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতা না আসলে তাদের কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। তাদের না আসার সুযোগই নিচ্ছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ভিজিলেন্স টিমের ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সেন চরচাকে বলেন, “আমরা যতগুলো অভিযোগ পেয়েছি তার সবগুলোই সমাধান করেছি। এছাড়া যাত্রীদের সেবায় সব সময় কাজ করে যাচ্ছি।”
সবার উপস্থিততে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আসলে অনেক যাত্রী মাঝ রাস্তা বা গন্তব্যের আগেই নেমে যাচ্ছেন তাদের থেকে সম্পূর্ণ রুটের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি।”

যা বলছে সরকারি তথ্য
বৃহস্পতিবার তথ্য অধিদপ্তরের এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, সড়কপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি ঠেকাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক পরিবহনকে জরিমানা করা হয়েছে ও আদায় করা অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়, রাজধানীর ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এলাকার অভিযানে দুটি মামলায় পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার দায়ে ইলিশ পরিবহন ও যমুনা হাই ডিলাক্সকে এই জরিমানা করা হয়। ধোলাইপাড় এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে চারটি পরিবহনকে ১৩ হাজার টাকা ও সায়েদাবাদ এলাকায় তিনটি পরিবহনকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেওয়া হয়।
এছাড়া উত্তরার আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ভাড়ার তালিকা না রাখা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে দুটি কাউন্টারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়াও, কল্যাণপুর, গাবতলী, হেমায়েতপুর ও সাভার এলাকায় পৃথক অভিযানে চারটি মামলায় সাত হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারি কোনো কাজে দিচ্ছে না। ঈদযাত্রায় বাড়তি ভাড়া দিয়েই রাজধানী ছাড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। আনন্দের যাত্রায় শুধু অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর অতিরিক্ত খরচের চাপ।
এবার ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে গত ১৭ মার্চ থেকে। আজ বৃহস্পতিবারও ঢাকা থেকে দেশের নানা প্রান্তে ছুটছেন ঘরমুখো মানুষ। ঈদযাত্রার শুরু থেকেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত আদায় বন্ধে কড়াকড়ির ঘোষণা দেওয়া হয়।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ও বিভিন্ন টার্মিনাল পরিদর্শন করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টদের। তবে বাস্তবে অতিরিক্ত ভাড়া এবং বাস ছাড়তে দেরি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা।
মন্ত্রী রবিউল আলমের গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, “সবাই নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছে। বরং দুয়েকটি পরিবহন নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও ২০-৩০ টাকা কম নিচ্ছে, যা যাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক।”
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি, এবার ঈদে ভাড়া নৈরাজ্য অতীতের সব রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর বলেছেন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যাত্রীরা বলছেন, নির্ধারিত ভাড়া নিশ্চিত করা এবং সময়মতো বাস ছাড়ার বিষয়টি কার্যকরভাবে তদারকি না করলে ঈদযাত্রার ভোগান্তি কমবে না।

আজ বৃহস্পতিবার গাবতলী ও মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে অনেক যাত্রী বাসের অপেক্ষায় রয়েছেন। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বাস ছাড়ছে না। কখন বাস আসবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যও দিতে পারছেন না কাউন্টারে দায়িত্বরতরা।
ভাড়া যে বেশি নেওয়া হচ্ছে তা সরকারের এক তথ্য বিবরণীতেও উঠে এসেছে। এর দায়ে জরিমানা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
নেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে জামালপুরের সানন্দবাড়ীর যাত্রী রাকিব হাসানের অভিযোগ, একতা পরিবহনের ৫০০ টাকার ভাড়া তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৭০০ টাকা। একইভাবে মৌলভীবাজারগামী রাজু আহমেদ বলেন, বিলাস পরিবহনের ৫৫০ টাকার ভাড়া তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৭০০ টাকা। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বিলাস পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মিজান দাবি করেন, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে না।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী নিলুফার ইয়াসমিন স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রংপুরের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। চরচাকে তিনি বলেন, “এনা ট্রান্সপোর্টে এক হাজার ৫০ টাকার ভাড়ার জায়গায় এক হাজার ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর চেয়েও বড় সমস্যা, দুপুর ১টায় বাস ছাড়ার কথা থাকলেও বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাস আসেনি। পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাস যানজটে আটকে আছে এবং আরও ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”
নাটোরের বাসের জন্য অপেক্ষারত মো. মাসুদুর রহমান অভিযোগ করেন, ৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এরপর ৩-৪ ঘণ্টা ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এনা ট্রান্সপোর্টের কাউন্টার মাস্টার অর্জুন বলেন, “সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হচ্ছে না। অনেক সময় নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট না থাকায় যাত্রীরা অন্য রুটের টিকিট নিচ্ছেন, ফলে ভাড়া বেশি মনে হচ্ছে।” বাস বিলম্বের কারণ হিসেবে তিনি সড়কে যানজটের কথা উল্লেখ করেন।

মহাখালীতে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত মনিটরিং করলেও বাড়তি ভাড়া আদায় থামছে না।
‘টিকিট নেই, তাই ভাড়া বেশি’
একতা ট্রান্সপোর্টের যাত্রী শামীমা আক্তার অভিযোগ করেন, বগুড়ার নিয়মিত ভাড়া ৫৫০ টাকা হলেও ঈদ উপলক্ষে ৬৯০ টাকা নেওয়া হয়েছে। একই পরিবহন থেকে রংপুরগামী জুঁই বলেন, প্রতিটি টিকিটে ২০০ টাকা করে বেশি নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার নিয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে একতা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার হাসনাত বলেন, “অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট না থাকায় কাছাকাছি অন্য গন্তব্যের টিকিট দেওয়া হচ্ছে, ফলে ভাড়া কিছুটা বেশি হচ্ছে।”
গাবতলী বাস টার্মিনালের চিত্র
গাবতলী যাত্রীদের চাপ কম থাকলেও, সব গন্তব্যে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
গাবতলী থেকে মাগুরার ভাড়া ৫০০ টাকা, তবে ঈদের আগে এই গন্তব্যের টিকিট ৮০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন ইমরান হোসেন। শুধু তিনি একা নন, এই আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার ভাড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি বেড়েছে। যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হলেও দেখার কেউ নেই। যাত্রীদের নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ভিজিলেন্স টিম থাকলেও, তাদের বিরুদ্ধে বসে সময় কাটানোর অভিযোগ অনেকের।
গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, দূরপাল্লার বেশির ভাগ বাসের টিকিট কাউন্টার ফাঁকা ও যাত্রীদের ভিড় কম। তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাস কনডাক্টররা ডেকে যাত্রীদের আকর্ষণ করছেন। অনেক বাসের টিকিট টার্মিনালের ভিতরে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকা থেকে রাজবাড়ীর ভাড়া ৩৯০ টাকার জায়গায় এখন ৫০০, ফরিদপুরে ৪০০ টাকা হলেও এখন ৬০০, নাটোরের ভাড়া ৬০০ টাকা হলেও এখন ৮০০, যশোরের ভাড়া ৬৫০ হলেও এখন এক হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বগুড়া, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার স্বাভাবিক সময়ের ভাড়ার চেয়ে ২০০ টাকার বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
গাবতলী টার্মিনালে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। তবে সবার সামনে বাড়তি ভাড়া নিলেও যাত্রীদের অভিযোগ, তাদের দেখার কেউ নেই। একদিকে যাত্রীরা আগাম টিকিট না পেয়ে দায়ে পড়েই বেশি ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। ভিজিলেন্স টিম নামমাত্র টহল দিয়ে বেশিরভাগ সময় অস্থায়ী বুথে বসে সময় কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
ভিজিলেন্স টিমের এক সদস্য জানান, গত তিন দিনে তারা ৩০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছে, যেগুলোর সমাধান করা হয়েছে।

আল আমিন হোসেন নামের একজন যাত্রী বলেন, “সৌহার্দ্য পরিবহন রাজবাড়ির ভাড়া নিচ্ছে ৬০০ টাকা। এই রুটে বাসের ভাড়া ৪০০ টাকা।”
মিনারুল নামের একজন যাত্রী বলেন, “আমি ফরিদপুর যাব। আগে টিকিট কাটতে পারিনি। এই রুটের ভাড়া সাড়ে তিনশ টাকা হলেও তারা ৬০০ নিয়েছে। বাড়ি যেতে হবে তাই বাধ্য হয়ে টিকিট নিলাম।”
ফজলুল হক নামের একজন যাত্রী বলেন, “বাস ছাড়া সময় ছিল দেড়টায়। তবে কাউন্টার গিয়ে শুনি গাড়ির সমস্যা হয়েছে। বাস আসতে তিনটা বেজে যাবে।”
রবিউল নামের একজন যাত্রী বলেন, “আমি ফরিদপুর যাব। বাসের লোকজন ডেকে ডেকে যাত্রী নিচ্ছে বেশি ভাড়ায় কিন্তু প্রশাসনের কেউ দেখার নাই। সবাই নিজেদের অস্থায়ী বুথেই সময় কাটান। মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতা না আসলে তাদের কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। তাদের না আসার সুযোগই নিচ্ছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ভিজিলেন্স টিমের ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সেন চরচাকে বলেন, “আমরা যতগুলো অভিযোগ পেয়েছি তার সবগুলোই সমাধান করেছি। এছাড়া যাত্রীদের সেবায় সব সময় কাজ করে যাচ্ছি।”
সবার উপস্থিততে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আসলে অনেক যাত্রী মাঝ রাস্তা বা গন্তব্যের আগেই নেমে যাচ্ছেন তাদের থেকে সম্পূর্ণ রুটের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি।”

যা বলছে সরকারি তথ্য
বৃহস্পতিবার তথ্য অধিদপ্তরের এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, সড়কপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি ঠেকাতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক পরিবহনকে জরিমানা করা হয়েছে ও আদায় করা অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রীদের ফেরত দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়, রাজধানীর ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এলাকার অভিযানে দুটি মামলায় পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার দায়ে ইলিশ পরিবহন ও যমুনা হাই ডিলাক্সকে এই জরিমানা করা হয়। ধোলাইপাড় এলাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে চারটি পরিবহনকে ১৩ হাজার টাকা ও সায়েদাবাদ এলাকায় তিনটি পরিবহনকে ১১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেওয়া হয়।
এছাড়া উত্তরার আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ভাড়ার তালিকা না রাখা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে দুটি কাউন্টারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়াও, কল্যাণপুর, গাবতলী, হেমায়েতপুর ও সাভার এলাকায় পৃথক অভিযানে চারটি মামলায় সাত হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।