Advertisement Banner

এনবিআরের সিটা প্রকল্পে ৫ গুণ বেশি দামে কেনাকাটা, বিদেশ ভ্রমণেই বরাদ্দ ৩৫ কোটি!

এনবিআরের সিটা প্রকল্পে ৫ গুণ বেশি দামে কেনাকাটা, বিদেশ ভ্রমণেই বরাদ্দ ৩৫ কোটি!

দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সরকারি খাতের আধুনিকায়নের জন্য গৃহীত সিটা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আরও ভালো করে বললে সিটা প্রকল্পের আওতাধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আধুনিকায়নে অত্যধিক ব্যয়, সংবেদনশীল তথ্য পাচার ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া নিয়ে কথা উঠেছে। কিন্তু এনবিআর বিষয়টি একইভাবে অক্ষুণ্ন রাখতে চায় বলে অভিযোগ তুলেছেন খাত বিশেষজ্ঞরা।

মূলত বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের স্ট্রেংদেনিং ইনস্টিটিউশনস ফর ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট্যাবিলিটি (সিটা) ঋণ প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। ২৫ কোটি মার্কিন ডলারের (বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৩০০০ কোটি টাকা) এই ঋণ প্রকল্প পাঁচটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকায়নে কাজ করবে, যার মেয়াদ ২০৩০ সালের মে পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো–বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিকল্পনা বিভাগ, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক।

এনবিআরের আধুনিকায়নে সিটা প্রকল্পের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে এই বরাদ্দ ব্যয়ে এরই মধ্যে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষত হার্ডওয়্যার কেনা বাবদ প্রয়োজনের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি টাকা ব্যয় করা এবং দেশের রাজস্ব সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এ সম্পর্কিত প্রমাণ পাওয়া গেছে প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত থেকেই। প্রকল্পের বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি ও দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এরই মধ্যে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়ে নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি এগোচ্ছে আগের পথ ধরেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকল্পের বর্তমান নকশা ও বরাদ্দ বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তথ্যপাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

অন্তবর্তী সরকারের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি ভেন্ডরগণ বাংলাদেশের রাজস্ব সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত পরীক্ষা ও পর্যালোচনার নামে বা programming-এর নামে বিদেশে চলে গিয়েছে, কাজ সমাপ্ত করেনি। বিদেশি বিশেষজ্ঞ ভেন্ডর পরবর্তী প্রয়োজনীয় মুহূর্তে পাওয়া যায়নি এবং দাতাসংস্থার কর্তৃত্বে তাদের পুনঃনিয়োগে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।”

একে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “এটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং এর তথ্য উপাত্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ বিড়ম্বনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও ভেন্ডরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে আগের অটোমেশন প্রকল্পগুলোও সফল হয়নি। তা সত্ত্বেও সিটা প্রকল্পে পুনরায় ব্যর্থ বিদেশি কোম্পানি এবং ক্লোজড-সোর্স প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের উদ্যোগ চলছে।

এ ক্ষেত্রে মুখ্যত আইভাস প্রকল্পে অভিজ্ঞতাকে সামনে আনছেন বিশেষজ্ঞরা। এনবিআরের ভ্যাট অটোমেশন সিস্টেম (আইভাস) তৈরিতে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সিস্টেমটি কার্যকর হয়নি। এর আগে ই-রিটার্ন সিস্টেম তৈরিতে এনবিআর ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠান বাইটেক্সকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা দিলেও তা কোনো কাজেই দেয়নি। একই কাজ পরে ২০২১ সালে মাত্র ১০ কোটি টাকায় সফলভাবে তৈরি করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি। কিন্তু সেই একই দিকে এবার আবার এনবিআর ঝুঁকছে বলে অভিযোগ, যার সঙ্গে আমলাতন্ত্রের স্বার্থ জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দেশের তথ্য নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশি ভেন্ডরের হাতে মূল তথ্য ও কোডের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের সক্ষমতা থাকলেও এ ধরনের প্রকল্পে তাদের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা সব আমলেই দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে এমনভাবে শর্ত আরোপ করা হয়, যাতে দেশীয় কোম্পানিগুলো দরপত্রে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারিয়ে বসে।

কর্মকর্তাদের অবস্থান ও ব্যয় যাচাই

৫ গুণ অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে গত বছরের ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) সভায় সিদ্ধান্ত হয়, হার্ডওয়্যারের মূলধন ব্যয়ের জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি বাজার দর যাচাই করে সুপারিশ করবে।

প্রকল্পের বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি ও দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের তৈলি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের হার্ডওয়্যার ও ডেটা সেন্টার বাবদ ব্যয় ৪০-৫০ কোটি টাকা সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু প্রকল্প প্রস্তাবে এ খাতে ২০০ কোটি টাকার ব্যয় ধরা হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলনের ৫ গুণ। ঠিক একইভাবে আইভাস আপগ্রেডেশন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭০ কোটি টাকা, যা ১০ কোটি টাকায় বাস্তবায়ন সম্ভব। শুধু তাই নয়, বিদেশ ভ্রমণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাবদ রাখা হয়েছে ৩৫ কোটি টাকার বরাদ্দ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মকর্তারা ব্যয়ের অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনার চেয়ে তথ্য গোপন রাখাতেই বেশি আগ্রহী। এ নিয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য ইকবাল চরচাকে বলেন, “অপচয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে কর্মকর্তারা সেটি ‘সরকারের গোপন নথি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এড়িয়ে যান।”

প্রশিক্ষণ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের যুক্তি

অবশ্য এনবিআরও আইভাস সিস্টেমের জন্য ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দের যুক্তি হিসেবে একটি ‘স্যাপ (এসএপি) ট্রেনিং একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা দেখিয়েছে। কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এটি ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমাবে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা একে ‘বাজে যুক্তি’ ও ‘হাস্যকর অজুহাত’ আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, এনবিআরের কারিগরি জনবল যেখানে ভেন্ডর ম্যানেজমেন্টে দক্ষ নয়, সেখানে এই একাডেমি শুধু বরাদ্দ বৈধতার হাতিয়ার মাত্র।

এ বিষয়ে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্য ইকবাল বলেন, “এটার ওনারশিপে থাকছে সরকারের নাম; কিন্তু এটা মেইনটেইনও করাতে হবে সেই ভিয়েতনামের কোম্পানিকে দিয়ে। কাজেই এটাকে আমি একটা ক্লাসিক্যাল ভেন্ডর লক সিচুয়েশনের উদাহরণ হিসাবে দেখছি।”

দেশীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে একটি বার্ষিক ব্যবস্থাপনা ব্যয় ধরতে হয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো সাধারণত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় কাজ পাওয়ার লক্ষ্যে তুলনায় কম দর হাঁকে। কিন্তু বছর বছর ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাবদ বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়ের বোঝা চাপে।

আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ

এই প্রকল্প এভাবে চলতে দেওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ যুক্ত বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, প্রকল্পের নকশা মূলত ‘প্রযুক্তি-অজ্ঞ’ পরামর্শক এবং বিদেশ ভ্রমণ-প্রিয় কর্মকর্তাদের স্বার্থে তৈরি। ৩১৫ কোটি টাকার একটি উপ-প্রকল্পে ৩৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রশিক্ষণের জন্য, যা বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ছাড়া কিছু নয়।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ নীতিগতভাবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একমত হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘সরকারই ভালো বোঝে’ মনোভাব দেখাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তারা বলছেন, বিশ্বব্যাংকের ঋণপ্রস্তাব পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও কর্মকর্তারা তা কাজে লাগাতে অনাগ্রহী।

নিজস্ব প্রযুক্তি বনাম ব্যর্থ বিদেশি সিস্টেম

এর আগে এনবিআরের ভ্যাট অটোমেশন সিস্টেম আইভাস তৈরিতে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সিস্টেমটি কার্যকর হয়নি। এর আগে ই-রিটার্ন সিস্টেম তৈরিতে এনবিআর ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠান বাইটেক্সকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা দিলেও তা কোনো কাজেই দেয়নি। একই কাজ ২০২১ সালে মাত্র ১০ কোটি টাকায় সম্পন্ন করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি। দেশীয় আইটি বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছেন। তারা বলছেন, দেশীয় সক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশে অধিকাংশ সময়ই অকারণে বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ বাস্তবে দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই অনেক ক্ষেত্রে কম খরচে, দক্ষতার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে বড় জাতীয় সিস্টেম তৈরিতে সক্ষম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন সিস্টেম তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সীমিত ব্যয়ে তৈরি এই দেশীয় সমাধান সফলভাবে ৪০ লাখের বেশি করদাতাকে সেবা দিচ্ছে।

এ বিষয়ে, সিনেসিস আইটির চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার (সিএসও) আমিনুল বারী শুভ্র চরচাকে বলেন, “সময় এসেছে উপলব্ধি করার যে, অযথা বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা শুধু প্রয়োজনহীনই নয়, এতে জনগণের অর্থের অপচয়ও ঘটে।”

এই প্রযুক্তিবিদ বলেন, দেশীয় সফটওয়্যার সম্পূর্ণ নিরাপদ। কারণ, কোডের মালিকানা সরকারের হাতে থাকে এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচও তুলনামূলকভাবে নগণ্য। অন্যদিকে বিদেশি সিস্টেমে তথ্য বিদেশে যায়, কোডের নিয়ন্ত্রণ থাকে বিদেশি ভেন্ডরের হাতে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বছরে ২০-৩০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে অধ্যাপক অনিন্দ্য ইকবাল বলেন, “এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে কেনা বিদেশি সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার অবকাঠামোতে আবদ্ধ হয়ে রক্ষণাবেক্ষণে বছরে ৩০-৪০ শতাংশ অর্থ বিদেশি কোম্পানিকে অযথা দিয়ে যেতে হবে বহু বছর।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রমাণিত ব্যর্থ সিস্টেমে পুনরায় বড় বিনিয়োগ করা দেশের জন্য প্রযুক্তিগতভাবে বিপজ্জনক। এটি ৪০০০ প্রকৌশলীর কর্মসংস্থান নষ্ট করে। আর দেশের তথ্য নিরাপত্তা পড়ে হুমকির মুখে।

প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও বিশেষজ্ঞদের হিসাব

ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা ও কর্মকর্তাদের যুক্তি
নামপ্রস্তাবিত ব্যয় (টাকা)বিশেষজ্ঞ প্রাক্কলনকর্মকর্তাদের অবস্থান/যুক্তি
হার্ডওয়্যার ও ডেটা সেন্টার২০০ কোটি৪০-৫০ কোটিটেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে বাজার দর যাচাই করা হবে
iVAS আপগ্রেডেশন৩৭০ কোটি১০ কোটি (দেশীয় বিকল্প)এসএপি ট্রেনিং একাডেমি করে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো হবে
বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ৩৫ কোটিপ্রয়োজন নেইহাই-এন্ড প্রযুক্তির জন্য কর্মকর্তাদের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ জরুরি
তথ্য নিরাপত্তা ও কারিগরি সার্বভৌমত্বের তুলনা
বিষয়বিদেশি ভেন্ডর (iVAS/SITA)দেশীয় সফল মডেল (eReturn)
তথ্য নিরাপত্তাতথ্য বিদেশে পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ আছেডেটা সম্পূর্ণ বাংলাদেশে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সুরক্ষিত
সোর্স কোড মালিকানাভেন্ডারের কাছে (SAP), বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেইসরকারের কাছে পূর্ণ কারিগরি মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আছে
রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বছরে ২০-৩০ কোটি (বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য)নামমাত্র ব্যয় (দেশীয় মুদ্রায় ও স্থানীয় প্রকৌশলী দ্বারা)
সফলতার হার৪০০ কোটি খরচ করেও সফল হয়নিমাত্র ১০ কোটিতে সফল

বিশেষজ্ঞদের আহ্বান ও দেশীয় প্রযুক্তি অগ্রাধিকার

এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের নকশা স্থগিত করে ‘দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পকে অগ্রাধিকার’ দিয়ে পুনর্গঠন করতে গত নভেম্বরে ৩২ জন বিশেষজ্ঞ (বুয়েটের ২০ জন অধ্যাপক, মাইক্রোসফট ও স্যামসাং-এর প্রকৌশলীরা অন্তর্ভুক্ত) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তাদের দাবি, তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশীয় যে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তার প্রয়োগ জরুরি। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করায় অটোমেশনের বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, রেলওয়ে, রাজউক, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থার স্বচ্ছতা আনা, জন্ম নিবন্ধন, নামজারির মতো জনসেবার উন্নয়ন করা দেশীয় জনবল আর উন্মুক্ত প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজেই সম্ভব। উচ্চমূল্যে কেনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে আবদ্ধ বিদেশি সফটওয়্যারগুলো দেশে তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেত। এনবিআরের বর্তমান এসএপিভিত্তিক আইভাসের পরিবর্তে দেশেই এই সফটওয়্যার তৈরি করা জরুরি। এতে সেবার মান বৃদ্ধি পেত এবং প্রায় ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো, যা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার তৈরিতে ব্যয় করা যেত। বিদেশি ভেন্ডর ও অপ্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারে ব্যয় দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।

আইটি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যে বিদেশি ভেন্ডর তথ্য নিয়ে পালানোর নজির তৈরি করেছে, তাদেরকেই পুনরায় কাজ দেওয়া সুশাসনের চরম পরিপন্থী। ২৫ কোটি ডলারের ঋণের সিংহভাগই বিদেশ ভ্রমণ এবং অপ্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারে ব্যয় হচ্ছে, যার কোনো ‘ইকোনমিক রিটার্ন’ নেই। এটি মূলত দেশীয় প্রকৌশলীদের কর্মসংস্থান নষ্ট করে দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে চিরস্থায়ীভাবে পরাধীন করার একটি আমলাতান্ত্রিক নীল নকশা।

গত বছরের ১০ জুলাই এ নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ২ বিশেষ সহকারী ও পাঁচটি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সভায় একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির বিশেষজ্ঞরা সিটা প্রকল্পের আত্মধ্বংসী দিকগুলো তুলে ধরে উদ্বেগ জানান। একই সঙ্গে তারা প্রকল্পটি একটি স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামতের ভিত্তিতে পরিমার্জনের সুপারিশ করেন। কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কর্তাব্যাক্তিরা এ সুপারিশ কানে তোলেনি। নির্বাচিত সরকার আসার পরও এই প্রকল্পের বিদ্যমান নকশা থেকে সরে আসেনি এনবিআর। বরং আগের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রবণতা লক্ষ্যণীয় মাত্রায় রয়েছে।

মার্চ ২০২৬-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে উপ-প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মূল আইটি পরামর্শকদের চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রশাসনিক কাঠামো সক্রিয় হয়েছে। তবে ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখের হালনাগাদ ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় বড় হার্ডওয়্যার ক্রয়, ডেটা সেন্টার উন্নয়ন এবং সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের কাজগুলো এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের দাবি উপেক্ষা করে বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়াই প্রকল্পের কাজ চলছে। এমনকি প্রকল্পের দরপত্রে আবেদন করার যোগ্যতার ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে শর্তারোপের অভিযোগও আছে।

তবে এনবিআর এ বিষয়ে আশ্বস্ত করছে। তারা বলছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান যেন সুযোগ পায়, সেদিকে নজর দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান চরচাকে বলেন, “এ প্রকল্পের টেন্ডার (দরপত্র) এখনো হয়নি। টেন্ডারে দেশি-বিদেশি সবাই সুযোগ পাবে।”

সম্পর্কিত