পশ্চিমা দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট সামরিক বা রাজনৈতিক বলয়ের ওপর নির্ভর না করে এশিয়ার শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
আজ শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিজঅর্ডার: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘‘পশ্চিমা বিশ্বের নতুন শুল্ক নীতি ও বাণিজ্য বাধার কারণে প্রচলিত বিশ্বায়নের কাঠামো দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য যেমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে, তেমনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’’
এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় তুলে ধরে তিনি বলেন,‘‘ চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। চীন ইতোমধ্যেই বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।’’
অর্থনীতির মৌলিক দ্বিমুখী চরিত্র ব্যাখ্যা করে প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন, ‘‘বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এখনো কতিপয় পশ্চিমা বাজারের ওপর অতি-নির্ভরশীল। তবে উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য বাংলাদেশ বহু আগেই চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’’
এই বাস্তবতাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কেবল এশিয়া থেকে পণ্য আমদানি নয়, বরং আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশে উচ্চমানের ‘ভ্যালু এডিশন’ বা মূল্য সংযোজন করতে হবে। এরপর সেই পণ্যগুলো এশিয়ার অঞ্চলেই রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। অন্যভাবে বললে, এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থার (ভ্যালু চেইন) অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হতে হবে বাংলাদেশকে।’’
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধাকে একটি বড় ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক সোবহান। তার মতে, আগামী এক দশকে চীন ও ভারত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও একক শক্তিতে পরিণত হবে। তাই এই দুই প্রতিবেশী পরাশক্তির বিস্তৃত বাজার, বিনিয়োগ ও সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে দেশের উৎপাদন খাতকে একীভূত করার রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ একটি ছোট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হওয়ায় আমাদের সামনে বড় সুবিধা রয়েছে। কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ব্লকে বা জোটে ভিড়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে নিরপেক্ষ বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।’’