পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার কী? কীভাবে কাজ করে

পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার কী? কীভাবে কাজ করে

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার (ভিএসসি)— বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পরিচালিত এমন একটি বিশেষ সেবা কেন্দ্র, যেখানে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা এক ছাদের নিচে একাধিক সহায়তা পান। আইনগত, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা যেন নিরাপদ পরিবেশে ন্যায়বিচার পেতে পারেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন— সে লক্ষ্যেই ২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ করছে এই সেন্টারগুলো।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার অধীনে পরিচালিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলোতে ভুক্তভোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী মামলা দায়ের, তদন্ত কার্যক্রমে সহায়তা এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমন্বিত সেবা দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ দিন পর্যন্ত নিরাপদ আবাসন, খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরদের মাধ্যমে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত ভুক্তভোগীদের কাউন্সেলিং দেওয়া হয়, যাতে তারা মানসিকভাবে শক্ত হয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার ভিকটিমদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা এবং হটলাইনভিত্তিক কুইক রেসপন্স টিমের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়া হয়।

কোথায় আছে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার?

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধান কেন্দ্রসহ রাজধানী ও প্রতিটি বিভাগের মেট্রোপলিটন এলাকায় এসব সেন্টার রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায়ও একটি কক্ষে এই সেবা কার্যক্রম চালু আছে।

যা বলছে পুলিশ

ডিএমপির উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘‘ডিএমপিতে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, নিপীড়ন ও সাইবার হ্যারেজমেন্ট সংক্রান্ত যেসব মামলা হয়, তার একটি অংশ আমরা তদন্ত করি। তবে সাইবার বিষয়ক অধিকাংশ মামলা ডিবি সাইবার ইউনিটে যায়। আমাদের কাছে নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলাই বেশি আসে।’’

ডিসি ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, ‘‘ধর্ষণ, যৌন হয়রানি কিংবা নির্যাতনের শিকার শিশু ও নারীদের আইনি সহায়তার পাশাপাশি কাউন্সেলিং সেবাও দেওয়া হয়ে থাকে। যাতে করে তাদের মনোবল শক্ত হয়।’’

ফারহানা ইয়াসমিনের মতে, শিশু ও নারীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। তবেই তারা নিরাপত্তা বোধ করবে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ)

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মোট ২৫৫টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় ইউনিটটি। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ১২৬টি, অপহরণ ৪৮টি, শ্লীলতাহানি ২৯টি এবং যৌন হয়রানির মামলা ৫২টি। একই সময়ে ১১৫টি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল এবং ৫৩টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

নারী ও শিশুদের নিরাপত্তায় রয়েছে পুলিশের হটলাইন নম্বর

নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বিভিন্ন হটলাইনও চালু রয়েছে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স— এই তিনটি মৌলিক সেবা এক নম্বরে পাওয়া যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ কিংবা বিপদে পড়া ব্যক্তিরা ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে এই নম্বরে সহায়তা চাইতে পারেন। এছাড়াও ফেসবুকেও অভিযোগ নিতে facebook.com/pcsw.phq নামে একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন নামে একটি হটলাইন চালু করে। ০১৩২০০০০৮৮৮ নম্বরে ফোন করে সাইবার হয়রানির শিকার নারীরা আইনগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছেন। পাশাপাশি গত বছরের মার্চ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের অধীনে আরও কয়েকটি হটলাইন চালু করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ০১৩২০০০২০০১, ০১৩২০০০২০০২, ০১৩২০০০২২২২ এই হটলাইন নাম্বারগুলো ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। নারী ও শিশুদের জন্য Police Cyber Support for Women (PCSW) হটলাইন ০১৩২০০০৮৮৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল ও সাইবার সাপোর্ট ইউনিটের হটলাইনগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। ভুক্তভোগীরা ফোন করলে পুলিশ সদস্যরা আইনি পরামর্শ দেন এবং থানায় অভিযোগ হলে তা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মনিটরিং করা হয়।’’

পুলিশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় শুধু মামলা নয়, ভুক্তভোগীর মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো সেই সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

সম্পর্কিত