মানবসমাজের অগ্রগতির অন্যতম মূল ভিত্তি গবেষণা। নিত্য নতুন উদ্ভাবন, চলমান সমস্যার সমাধানে দেশে নানা রকম গবেষণা হয়ে আসছে। আর এই গবেষণার অর্থায়ন করে দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক গবেষণায় অনুদান দেয় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। স্নাতকোত্তর, পিএইচডি, এমফিল, পোস্ট ডক্টোরাল এই ক্যাটাগরিগুলোতে গবেষণায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো অনুদান প্রদান করে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন প্রতিবছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এই বছর বরাদ্দের পরিমাণ ২৬৬ কোটি টাকা। ২০২৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর, পিএইচডি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক গবেষণায় অনুদান প্রদান করার নিয়ম চালু করে। ইউজিসির নিয়ম অনুযায়ী, যেসকল শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তরে থিসিস করে তাদের ২৪ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। শিক্ষকরা তাদের মূল বেতনের সমান অনুদান পেয়ে থাকেন। ইউজিসি’র গবেষণা অর্থায়ন ও পরিচালনা সাধারণ নির্দেশিকা-২০২৬ অনুযায়ী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণায় ৮৫ শতাংশ এবং গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব পুরস্কার ও বিবিধ খরচে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সেল কতৃক এই অনুদান বণ্টন করা হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৯৯৭ সাল থেকে বায়োলজিক্যাল সায়েন্স, মেডিক্যাল সায়েন্স, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড এ্যাপ্লাইড সায়েন্স, ফিজিক্যাল সায়েন্স ও ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি গ্রুপসহ ৬টি গ্রুপে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হয়। প্রকল্পের গুরুত্ব অনুসারে ২ থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করা হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, দুজনের সমন্বয়ে একটি গবেষণা প্রস্তাবনার জন্য আবেদন করতে পারবে। একজন হবেন প্রধান গবেষক এবং অন্যজন সহযোগী গবেষক।
পোস্ট ডক্টরাল করার ২ বছর পর প্রধান গবেষক হিসেবে আবেদন করা যাবে। সেইসঙ্গে তাকে আন্তর্জাতিক অথবা আঞ্চলিক জার্নালে প্রকাশ পাওয়া ৫টি গবেষণার মূল গবেষক হতে হবে। গবেষণা কার্যক্রম সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে মূল্যায়নের জন্য নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকগণের সমন্বয়ে গঠিত পিয়ার রিভিউ কমিটির রয়েছে। কমিটি বিজ্ঞানী ও গবেষকগণের গবেষণা প্রস্তাবসমূহ যাচাই বাছাই করে। গবেষণা আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে গবেষণা প্রস্তাবনা পাঠাতে হয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ আইসিটি খাতের নিত্যনতুন উদ্ভাবনে গবেষণাবৃত্তি প্রদান করে থাকে। সরকারি বা সরকার-অনুমোদিত দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর, এমফিল, ডক্টরাল (পিএইচডি) এবং পোস্ট-ডক্টোরাল শিক্ষার্থীরা এই বৃত্তির জন্য আবেদন করতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী, স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীদের গবেষণাকালীন সময়ে প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা এবং আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ এককালীন ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ডক্টোরালে অনুদান পাওয়ার জন্য শর্ত হিসেবে আবেদনকারির স্নাতকোত্তরে ইংরেজিতে থিসিস থাকতে হবে। এমফিলের শিক্ষার্থীদেরও গবেষণাকালীন সময়ে প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা এবং আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ এককালীন ৪০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়, যার মেয়াদ সর্বোচ্চ ২ বছর। ডক্টোরালের শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক ৪০ হাজার টাকা হারে সর্বোচ্চ ৩ বছর অনুদান এবং আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ এককালীন ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পোস্ট-ডক্টোরালের শিক্ষার্থীদের মাসিক ৪০ হাজার টাকা করে ৬ মাস অনুদান এবং আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ এককালীন ৮০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এই চারটি ক্যাটাগরিতে প্রস্তাবিত গবেষণার জন্য অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান নেওয়া যাবে না। আবেদনকারীকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে এই লিংকে আবেদন করতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল
চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণাকে উৎসাহিত করতে স্কলারশিপ ও ফেলোশিপ দিয়ে থাকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি)। ওষুধের বৈচিত্র্য, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত গবেষণা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মূলত এই অনুদান দেওয়া হয়। প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে বিএমআরসি এই গবেষণা অনুদান দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষক বা কোনো গবেষণা দলের প্রধান বিএমআরসির লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ে অনুদানের আবেদন করতে পারেন। এছাড়া স্নাতকোত্তর পর্যায়ের মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক গবেষণার জন্য আবেদন করতে পারেন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিএমআরসি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে আবেদনের প্রেক্ষিতে অনুদান দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ
বিজ্ঞান ও শিল্প খাতের উন্নয়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) প্রতিবছর ১০০ জন গবেষককে ফেলোশিপ প্রদান করে। একটি নির্বাচনী পরীক্ষার মাধ্যমে ৩টি ক্যাটাগরিতে (পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট, ডক্টোরাল ও পোস্ট-ডক্টোরাল) এই ফেলোশিপ দেওয়া হয়। ফেলোশিপের ধরণ অনুযায়ী গবেষকদের প্রতি মাসে ৩৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা এবং গবেষণার আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। এই ফেলোশিপের মেয়াদকাল ১ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং মনোনীত ফেলোগণ আকর্ষণীয় ভাতার পাশাপাশি বিসিএসআইআরে বিদ্যমান গবেষণা সুবিধাদি পেয়ে থাকেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল পূর্বে ‘প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান’ নামের একটি গবেষণা ফেলোশিপ প্রদান করেছিল। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি -এর অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমফিল ও পিএইচডি গবেষক, স্বতন্ত্র গবেষক এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা আবেদনের সুযোগ পেত। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের অধীনে তাদের আওতাধীন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদেরই অনুদান প্রদান করা হচ্ছে।