রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পাশাপাশি জামায়াত, আর বিএনপির ভোট ক্যাম্প অফিস। একদিকে মাইকে বাজছে ইসলামী ওয়াজ, যেখানে নারী আর প্রেমের গুনগানে মুগ্ধ কবি-সাহিত্যিকদের সমলোচনা করা হচ্ছে। জোর দেওয়া হচ্ছে ইসলামী অনুশাসন কায়েমের। বিএনপির ক্যাম্প থেকে বাজছে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার গুনগান। উদ্দেশ্য ভোটারদের মন জয়। দল দুটির এ তৎপরতায় শব্দের দুষণ স্পষ্ট। কিন্তু নির্বাচনের আগে এই দুষণ বাংলাদেশের মানুষের মনে অন্যরকম উৎসবের আবহ তৈরি করে।
১৯৯১ সালের পর থেকে সবশেষ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তেমনটিই দেখা গেছে। কিন্তু এ কী! বাজারে ঘোরাঘুরি করা অনেকের মধ্যেই দেখা গেল নিস্পৃহতা কিংবা বিরক্তির ছাপ। চায়ের দোকানে দুই বন্ধুর চাপা কণ্ঠের আলোচনায় নির্বাচন নিয়ে আক্ষেপ শোনা গেল। তাদের শঙ্কা–এবারের একতরফা নির্বাচনের পরও অশান্ত থাকবে দেশ।
নিজের পরিচয় দিয়ে সদ্য বেকার হওয়া দুই বন্ধুর নাম জানতে চাইলে প্রথমে একটু ভড়কে গেল তারা। পরে চিৎকার করে বললেন, “‘দোসর ভাই, আওয়ামী লীগের দোসর’ মারবেন?” দোসর পেটানো সাংবাদিকের কাজ না। তবে, এই স্বঘোষতি হতাশার বিশ্লেষণ করাটা দ্বায়িত্ব।
কথা প্রসঙ্গে তারা বলল, আগের সরকারের রাজনৈতিক দলের সমর্থক হলেও একতরফা নির্বাচনগুলো ভালো লাগে নাই। তাদের ভাষ্য–এবারো হলো না। তাদের প্রশ্ন–এতে করে কি দেশে স্থিতিশীলতা আসবে?
এরপর সমর্থকের আবেগ নিয়েই তাদের একজন বললেন, “এই নির্বাচনে রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে অ্যান্টি আওয়ামী পক্ষ নিজেরা তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করে নিচ্ছে, নিক।” ক্ষণিক পরই অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে বললেন, “ভাই, আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
জিজ্ঞাসা করলাম, এবার কাকে ভোট দেবেন? একজনের সহজ উত্তর, “ভোট দেব না।’ অন্যজন কিছু বললেন না।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস ও জরিপভিত্তিক গবেষণা দেখায়, আওয়ামী লীগের কোর ও সফট সমর্থক মিলিয়ে ভোটার ভিত্তি ৩০-৫০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। নব্বই পরবর্তী সময়ের হিসাব বিবেচনায় নিলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল মোট ভোটের ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দলটি অংশ নেয়নি। একই বছরের ১২ জুনের নির্বাচনে তারা পায় মোট ভোটের ৩০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা পায় ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা ’৯০-পরবর্তী সময়ে সব দলের অংশ নেওয়া নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পড়ে তাদের বাক্সে।
১৯৯১ থেকে ২০১৮–এই সময়কালের নির্বাচন ফলাফল (বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন), এবং Asian Barometer Survey ও IFES-এর দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক সংকট, বর্জন কিংবা নেতৃত্বের অনুপস্থিতির সময়েও এই ভোটার বেজ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে একে বলা হয় latent voter base, যারা প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দ্রুত পুনরায় সংগঠিত হতে সক্ষম।
নির্বাচনে থাকা পক্ষগুলোর সামনে এই বিশালসংখ্যক ভোটারদের গতিবিধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশে থাকা দলটির নেতৃত্ব এখনো পরিষ্কার করে তাদের সমর্থকদের জন্য কোনো বার্তা দেয়নি। কখনো মনে হচ্ছে তারা ভোটকেন্দ্রে যাবে না, কখনো মনে হচ্ছে ফ্লোটিং ভোট হিসেবে ভিন্ন রকম প্রভাবকের ভমিকায় থাকবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের মতো পরিস্থিতিতে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও এমন স্ট্র্যাটিজি নিতে দেখা গেছে। নির্বাচনের আগে এই শক্তির প্রধান লক্ষ্য থাকে দৃশ্যমান অনুপস্থিতি, কিন্তু কার্যকর উপস্থিতি। এটি সাধারণত তিনভাবে ঘটতে দেখা গেছে–
প্রথমত, একদিকে নির্বাচনকে প্রকাশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করা, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরে প্রশাসনিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তরে প্রভাব বজায় রাখা। এই কৌশলটি পাকিস্তান (পিপিপি) ও শ্রীলঙ্কায় (এসএলএফপি) দেখা গেছে।
দ্বিতীয়ত, নিজস্ব সমর্থকদের সরাসরি মাঠে নামতে না বলা, কিন্তু বিরোধী শিবিরের ভেতরে বিভ্রান্তি তৈরি করার কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়। বিশেষ করে “এই নির্বাচনেও কিছু বদলাবে না” ধরনের ন্যারেটিভ ছড়ানোর একটা চেষ্টা থাকে।
তৃতীয়ত, নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়–যাতে পরবর্তী পর্যায়ে রাজনৈতিক দরকষাকষির জায়গা থাকে।
ফাইল ছবি
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা–এই তিনটি উপাদান তাদের সমর্থকদের কাছে এখনো প্রাসঙ্গিক। একেও কাজে লাগাতে চাইবে দলটি। যদি নতুন সরকার দুর্বল, বিভক্ত বা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে অতীতের শাসকগোষ্ঠীকে ঘিরে “সব খারাপ ছিল না” ধরনের ন্যারেটিভ শক্ত হয়, যা পাকিস্তানে পিপিপি ও নেপালে ইউএমএল-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারে কথা হওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের দুই বন্ধুর কথায়ও তেমন ইঙ্গিতই মেলে।
কী করছে আওয়ামী লীগ? যেমন দেখা যাচ্ছে
যেখানে বিএনপি-জামায়াত বা অন্যান্য বিরোধী শক্তি ভোটকে ঘিরে প্রভাব বিস্তার করছে, সেখানে আওয়ামী লীগ নিজেকে নীরব, কিন্তু সক্রিয় রাখার কৌশল অবলম্বন করছে। ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক উদাহরণ থেকে দেখা যায় বড় শক্তি নির্বাচনের আগে সরাসরি মাঠে না থাকলে তারা যেসব কৌশল অবলম্বন করে–
১. সংগঠন অক্ষুণ্ণ রাখা
২. ভোটার-ভিত্তি বজায় রাখা
৩. মিডিয়া ও সামাজিক নেটওয়ার্কে পরোক্ষ প্রভাব রাখার কৌশল গ্রহণ করে
এগুলো পরবর্তী রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে। এটি কেবল ভোটে জেতার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং বৈধতা পুনঃস্থাপনের জন্য করে দলগুলো। আওয়ামী লীগের গতিবিধিও তেমনটিই দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, বরং বিভাজন বাড়িয়ে তোলে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে দেখা গেছে, একক আধিপত্যশীল শক্তির বিপরীতে থাকা জোটগুলো আদর্শিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক অবস্থান, বক্তব্য ও কৌশল বিশ্লেষণ করলে বিভাজনের লক্ষণ অস্বীকার করা কঠিন।
কেবল অন্তর্ভুক্তিমূলক একটা নির্বাচন না হওয়ায় সরকার গঠন ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ভিন্ন লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। নির্বাচনের আগে সবার লক্ষ্য নির্বাচন ও ভোটারের মন জয় করা হলেও কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মানুষকে নির্বাচনের উৎসব থেকে বাইরে রাখার কারণে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ব্যাতিক্রমী ও ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ নিয়ে চরচার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজনীতিক থেকে শুরু করে আইনজ্ঞসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শুধু তা কেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে সবসময় কথা বলে আসছেন বিশিষ্টজনরা।
চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের বলেন, “আওয়ামী লীগের ভোটার যারা আছেন, দেশের কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোক তো এদের সমর্থন করে। এটা তো আমরা অস্বীকার করতে পারব না। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৩০ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এরা কারা হতে পারে আসলে? আওয়ামী লীগের ভোটার যারা আছে, তাদের যে আপনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিচ্ছেন না, অথবা তারা যে এটা প্রয়োগ করতে পারছে না–এটা নিশ্চয় ডেমোক্রেসির জন্য ভালো না।”
জুলকারনাইন একইসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগের যারা আছেন, তাদের চরিত্রে পরিবর্তন আনতে হবে–এর কোনো ব্যত্যয় নাই। একইসঙ্গে যারা অপরাধে যুক্ত ছিল, তাদের বিচার হতে হবে।
বিভিন্ন রাজনীতিক, আইনজ্ঞের তরফ থেকেও বারবার এই একই বক্তব্য এসেছে। এসেছে রিকনসিলিয়েশনের কথা। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং তাদের ভোটব্যাংকের প্রভাব এক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মাঠে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ দেখেও এই বিষয়টি সামনে আসছে।
ফাইল ছবি: চরচা
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পাশাপাশি জামায়াত, আর বিএনপির ভোট ক্যাম্প অফিস। একদিকে মাইকে বাজছে ইসলামী ওয়াজ, যেখানে নারী আর প্রেমের গুনগানে মুগ্ধ কবি-সাহিত্যিকদের সমলোচনা করা হচ্ছে। জোর দেওয়া হচ্ছে ইসলামী অনুশাসন কায়েমের। বিএনপির ক্যাম্প থেকে বাজছে দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার গুনগান। উদ্দেশ্য ভোটারদের মন জয়। দল দুটির এ তৎপরতায় শব্দের দুষণ স্পষ্ট। কিন্তু নির্বাচনের আগে এই দুষণ বাংলাদেশের মানুষের মনে অন্যরকম উৎসবের আবহ তৈরি করে।
১৯৯১ সালের পর থেকে সবশেষ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তেমনটিই দেখা গেছে। কিন্তু এ কী! বাজারে ঘোরাঘুরি করা অনেকের মধ্যেই দেখা গেল নিস্পৃহতা কিংবা বিরক্তির ছাপ। চায়ের দোকানে দুই বন্ধুর চাপা কণ্ঠের আলোচনায় নির্বাচন নিয়ে আক্ষেপ শোনা গেল। তাদের শঙ্কা–এবারের একতরফা নির্বাচনের পরও অশান্ত থাকবে দেশ।
নিজের পরিচয় দিয়ে সদ্য বেকার হওয়া দুই বন্ধুর নাম জানতে চাইলে প্রথমে একটু ভড়কে গেল তারা। পরে চিৎকার করে বললেন, “‘দোসর ভাই, আওয়ামী লীগের দোসর’ মারবেন?” দোসর পেটানো সাংবাদিকের কাজ না। তবে, এই স্বঘোষতি হতাশার বিশ্লেষণ করাটা দ্বায়িত্ব।
কথা প্রসঙ্গে তারা বলল, আগের সরকারের রাজনৈতিক দলের সমর্থক হলেও একতরফা নির্বাচনগুলো ভালো লাগে নাই। তাদের ভাষ্য–এবারো হলো না। তাদের প্রশ্ন–এতে করে কি দেশে স্থিতিশীলতা আসবে?
এরপর সমর্থকের আবেগ নিয়েই তাদের একজন বললেন, “এই নির্বাচনে রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে অ্যান্টি আওয়ামী পক্ষ নিজেরা তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করে নিচ্ছে, নিক।” ক্ষণিক পরই অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে বললেন, “ভাই, আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
জিজ্ঞাসা করলাম, এবার কাকে ভোট দেবেন? একজনের সহজ উত্তর, “ভোট দেব না।’ অন্যজন কিছু বললেন না।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস ও জরিপভিত্তিক গবেষণা দেখায়, আওয়ামী লীগের কোর ও সফট সমর্থক মিলিয়ে ভোটার ভিত্তি ৩০-৫০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। নব্বই পরবর্তী সময়ের হিসাব বিবেচনায় নিলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট ছিল মোট ভোটের ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দলটি অংশ নেয়নি। একই বছরের ১২ জুনের নির্বাচনে তারা পায় মোট ভোটের ৩০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা পায় ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা ’৯০-পরবর্তী সময়ে সব দলের অংশ নেওয়া নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পড়ে তাদের বাক্সে।
১৯৯১ থেকে ২০১৮–এই সময়কালের নির্বাচন ফলাফল (বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন), এবং Asian Barometer Survey ও IFES-এর দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক সংকট, বর্জন কিংবা নেতৃত্বের অনুপস্থিতির সময়েও এই ভোটার বেজ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে একে বলা হয় latent voter base, যারা প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দ্রুত পুনরায় সংগঠিত হতে সক্ষম।
নির্বাচনে থাকা পক্ষগুলোর সামনে এই বিশালসংখ্যক ভোটারদের গতিবিধি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশে থাকা দলটির নেতৃত্ব এখনো পরিষ্কার করে তাদের সমর্থকদের জন্য কোনো বার্তা দেয়নি। কখনো মনে হচ্ছে তারা ভোটকেন্দ্রে যাবে না, কখনো মনে হচ্ছে ফ্লোটিং ভোট হিসেবে ভিন্ন রকম প্রভাবকের ভমিকায় থাকবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের মতো পরিস্থিতিতে থাকা বিশ্বের বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলগুলোকেও এমন স্ট্র্যাটিজি নিতে দেখা গেছে। নির্বাচনের আগে এই শক্তির প্রধান লক্ষ্য থাকে দৃশ্যমান অনুপস্থিতি, কিন্তু কার্যকর উপস্থিতি। এটি সাধারণত তিনভাবে ঘটতে দেখা গেছে–
প্রথমত, একদিকে নির্বাচনকে প্রকাশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করা, অন্যদিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরে প্রশাসনিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তরে প্রভাব বজায় রাখা। এই কৌশলটি পাকিস্তান (পিপিপি) ও শ্রীলঙ্কায় (এসএলএফপি) দেখা গেছে।
দ্বিতীয়ত, নিজস্ব সমর্থকদের সরাসরি মাঠে নামতে না বলা, কিন্তু বিরোধী শিবিরের ভেতরে বিভ্রান্তি তৈরি করার কৌশল অবলম্বন করতে দেখা যায়। বিশেষ করে “এই নির্বাচনেও কিছু বদলাবে না” ধরনের ন্যারেটিভ ছড়ানোর একটা চেষ্টা থাকে।
তৃতীয়ত, নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়–যাতে পরবর্তী পর্যায়ে রাজনৈতিক দরকষাকষির জায়গা থাকে।
ফাইল ছবি
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা–এই তিনটি উপাদান তাদের সমর্থকদের কাছে এখনো প্রাসঙ্গিক। একেও কাজে লাগাতে চাইবে দলটি। যদি নতুন সরকার দুর্বল, বিভক্ত বা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে অতীতের শাসকগোষ্ঠীকে ঘিরে “সব খারাপ ছিল না” ধরনের ন্যারেটিভ শক্ত হয়, যা পাকিস্তানে পিপিপি ও নেপালে ইউএমএল-এর ক্ষেত্রে দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারে কথা হওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের দুই বন্ধুর কথায়ও তেমন ইঙ্গিতই মেলে।
কী করছে আওয়ামী লীগ? যেমন দেখা যাচ্ছে
যেখানে বিএনপি-জামায়াত বা অন্যান্য বিরোধী শক্তি ভোটকে ঘিরে প্রভাব বিস্তার করছে, সেখানে আওয়ামী লীগ নিজেকে নীরব, কিন্তু সক্রিয় রাখার কৌশল অবলম্বন করছে। ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক উদাহরণ থেকে দেখা যায় বড় শক্তি নির্বাচনের আগে সরাসরি মাঠে না থাকলে তারা যেসব কৌশল অবলম্বন করে–
১. সংগঠন অক্ষুণ্ণ রাখা
২. ভোটার-ভিত্তি বজায় রাখা
৩. মিডিয়া ও সামাজিক নেটওয়ার্কে পরোক্ষ প্রভাব রাখার কৌশল গ্রহণ করে
এগুলো পরবর্তী রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে। এটি কেবল ভোটে জেতার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং বৈধতা পুনঃস্থাপনের জন্য করে দলগুলো। আওয়ামী লীগের গতিবিধিও তেমনটিই দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বড় রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, বরং বিভাজন বাড়িয়ে তোলে। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে দেখা গেছে, একক আধিপত্যশীল শক্তির বিপরীতে থাকা জোটগুলো আদর্শিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক অবস্থান, বক্তব্য ও কৌশল বিশ্লেষণ করলে বিভাজনের লক্ষণ অস্বীকার করা কঠিন।
কেবল অন্তর্ভুক্তিমূলক একটা নির্বাচন না হওয়ায় সরকার গঠন ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ভিন্ন লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। নির্বাচনের আগে সবার লক্ষ্য নির্বাচন ও ভোটারের মন জয় করা হলেও কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মানুষকে নির্বাচনের উৎসব থেকে বাইরে রাখার কারণে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ব্যাতিক্রমী ও ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ নিয়ে চরচার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজনীতিক থেকে শুরু করে আইনজ্ঞসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শুধু তা কেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে সবসময় কথা বলে আসছেন বিশিষ্টজনরা।
চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের বলেন, “আওয়ামী লীগের ভোটার যারা আছেন, দেশের কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোক তো এদের সমর্থন করে। এটা তো আমরা অস্বীকার করতে পারব না। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৩০ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এরা কারা হতে পারে আসলে? আওয়ামী লীগের ভোটার যারা আছে, তাদের যে আপনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিচ্ছেন না, অথবা তারা যে এটা প্রয়োগ করতে পারছে না–এটা নিশ্চয় ডেমোক্রেসির জন্য ভালো না।”
জুলকারনাইন একইসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগের যারা আছেন, তাদের চরিত্রে পরিবর্তন আনতে হবে–এর কোনো ব্যত্যয় নাই। একইসঙ্গে যারা অপরাধে যুক্ত ছিল, তাদের বিচার হতে হবে।
বিভিন্ন রাজনীতিক, আইনজ্ঞের তরফ থেকেও বারবার এই একই বক্তব্য এসেছে। এসেছে রিকনসিলিয়েশনের কথা। কিন্তু সেটা হয়নি। ফলে নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং তাদের ভোটব্যাংকের প্রভাব এক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মাঠে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ দেখেও এই বিষয়টি সামনে আসছে।