সাইরুল ইসলাম

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মোড় এনে দিয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলার মসনদে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয় শুধু রাজ্যের সমীকরণকেই বদলে দেয়নি, বরং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কৌশলকেও এক নতুন বাঁকে দাঁড় করিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। কেননা, যে নেত্রী একসময় জাতীয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ‘কালীঘাটের দুর্গ’ সামলাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন, আজ নির্বাচনের পর তার আচমকা দিল্লিমুখী সক্রিয়তা ভারতের রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির কন্ট্রিবিউটিং এডিটর জয়ন্ত ঘোষালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনী ধাক্কার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত হিসাব কষে তার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তিনি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। বাংলায় এই মুহূর্তে কোনো বিধানসভা নির্বাচন নেই। রাতারাতি সরকার পরিবর্তনের কোনো আইনি সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি। কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরে তৃণমূল কংগ্রেস যে নজিরবিহীন সাংগঠনিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তা ঢাকতেই মমতার এই দিল্লি যাত্রা।
ভারতের বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যে তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। এনডিটিভি এবং আনন্দবাজার–উভয় সূত্রই নিশ্চিত করেছে, দলের বহু বিধায়ক ইতিমধ্যেই দলত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি বর্ষীয়ান নেতা সুখেন্দু শেখর দল এবং রাজ্যসভার পদ থেকে সরে গেছেন। লোকসভা বলতে গেলে মমতার আওতার বাইরে এখন। লোকসভার ২৮ জন তৃণমূল সদস্যের মধ্যে ২০ জনই মমতাকে ছেড়ে যোগ দিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরে। বিদ্রোহীরা বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ-তে যোগ দিতে চাইছেন। গতকাল সোমবার রাতেও বৈঠক করেছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা।
বাংলায় যখন রাজ্যস্তরের দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং দলবদল নিয়ে তৃণমূল সম্পূর্ণ কোণঠাসা, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব চতুরতার সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করতে চাইছেন
এতে দলীয় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। শুধু বিধানসভা ও লোকসভাই নয়, ভাঙন ধরেছে কলকাতার প্রশাসনেও। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের একাধিক কাউন্সিলরও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে খোলাখুলি বিদ্রোহ ঘোষণা করে পদত্যাগ করেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ, যা প্রতিদিন রাজ্য রাজনীতির মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতা ও রাজ্যসভার প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ের মতো ব্যক্তিত্বের পদত্যাগ এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী তথা নেত্রী কোয়েল মল্লিকের দল ছাড়ার জল্পনা দলের ভেতরের অস্থিরতাকে চরম সীমায় নিয়ে গেছে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সমস্ত লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক সাংসদ ফোন ধরছেন না এবং গোপন স্থানে বৈঠক করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এনডিটিভির কন্ট্রিবিউটিং এডিটর জয়ন্ত ঘোষাল বলছেন, এই তীব্র অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে দলের নজর ঘোরাতেই জাতীয় স্তরে পা বাড়াচ্ছেন মমতা।
ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, বাংলায় যখন রাজ্যস্তরের দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং দলবদল নিয়ে তৃণমূল সম্পূর্ণ কোণঠাসা, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব চতুরতার সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করতে চাইছেন।
রাজ্যে ‘ডিফেন্সিভ’ অবস্থানে থাকার চেয়ে জাতীয় স্তরে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘অফেনসিভ’ রাজনীতি করা অনেক বেশি লাভজনক–এটিই মমতার বর্তমান রণকৌশল। আর সেই পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ উত্থান। এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছেন না মমতা।
জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে এমন কিছু ইস্যু রয়েছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সেই ইস্যুগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এর মধ্যে রয়েছে–
অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব: দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানহীনতা এবং রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিকে সামনে রেখে আমজনতার ক্ষোভকে পুঁজি করা।
পররাষ্ট্র নীতির ব্যর্থতা: মোদি সরকারের পররাষ্ট্র নীতিতে ‘অসংলগ্নতা’ বা ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনকে (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে বিলম্ব) জাতীয় মঞ্চে বড় বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরা।
‘মডেল কেস’: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতে, বাংলার নির্বাচনে প্রশাসনিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেগুলোকে রাজ্যের পরাজয়ের গ্লানি হিসেবে না দেখে বরং বিজেপির দ্বারা ‘গণতন্ত্র হরণ’-এর একটি সর্বভারতীয় মডেল কেস হিসেবে বিরোধী জোটে পেশ করার পরিকল্পনা করছেন মমতা।

নির্বাচনের আগে এবং পরে মমতার অবস্থানের এক বিরাট ‘ইউ-টার্ন’ লক্ষ্য করা গেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বা আসন সমঝোতা ছিল না। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও পরবর্তীতে জনসমক্ষে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মমতার সাথে একটি কৌশলগত বোঝাপড়া চেয়েছিলেন এবং বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্ব জোটের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত ছিল।
কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণে মমতা তাতে সাড়া দেননি। সম্ভবত তিনি ভাবেননি যে নির্বাচনের ফলাফল এতটা বিপর্যয়কর হবে।
বাংলা সংবাদপত্র এই সময়-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরাজয়ের পর এই কৌশলগত ভুল বুঝতে পেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ (ক্ষতিপূরণ) নেমেছেন। তিনি আবার নিয়মিত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন। তবে এবারের যোগদানে একটি সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে। আগে যেখানে মমতা নিজেকে বিরোধী জোটের একমাত্র বা প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরার আগ্রাসী চেষ্টা করতেন–এবার তিনি সেই ভুল করছেন না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের সর্বাধিনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করছেন না। তিনি কোনো প্রধানমন্ত্রীত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সরাসরি প্রকাশ না করে নিজেকে একজন অত্যন্ত ‘সহযোগিতাপূর্ণ এবং সক্রিয় অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরছেন। তার মূল লক্ষ্য এখন নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়া নয় বরং বিরোধী সংহতি বজায় রাখা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মমতার এই জাতীয় রাজনীতির তৎপরতার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো সংসদের আসন্ন অধিবেশন। তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছে, যদি লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সুদৃঢ় করা যায়, তবে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও সুশাসনের অভাব নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে সংসদের ভেতরেই চরম কোণঠাসা করা সম্ভব হবে।
যদিও পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন ২০২৯ সালে। তা এখনো অনেক দূরে, তবুও মমতার হিসাব পরিষ্কার: সংসদীয় চাপ বাড়িয়ে জাতীয় স্তরে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তৈরি করা। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় স্তরে তার প্রাসঙ্গিকতা বাড়বে, অন্যদিকে বাংলার মানুষের কাছেও বার্তা যাবে যে, মমতাই বিজেপির বিরুদ্ধে প্রধান জাতীয় বিকল্প।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি এখন আর কেবল পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এবং থাকা সম্ভবও নয়। তৃণমূলের প্রথাগত ভোটব্যাংক এত সহজে রাতারাতি বিলীন হয়ে যাবে না। দলটির ভেতরে এখনো বহু নেতা বিশ্বাস করেন যে পরিস্থিতি আবার বদলাবে এবং রাজ্যে একটি তীব্র বিজেপি-বিরোধী হাওয়া তৈরি হবে। কিন্তু সেই সময়টুকু পাওয়ার জন্য এবং দলের সাংসদদের বিজেপির হাত থেকে বাঁচাতে মমতার সামনে দিল্লির আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় কমই আছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব মোড় এনে দিয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলার মসনদে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা তৃণমূল কংগ্রেসের এই নির্বাচনী বিপর্যয় শুধু রাজ্যের সমীকরণকেই বদলে দেয়নি, বরং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কৌশলকেও এক নতুন বাঁকে দাঁড় করিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। কেননা, যে নেত্রী একসময় জাতীয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ‘কালীঘাটের দুর্গ’ সামলাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন, আজ নির্বাচনের পর তার আচমকা দিল্লিমুখী সক্রিয়তা ভারতের রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির কন্ট্রিবিউটিং এডিটর জয়ন্ত ঘোষালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনী ধাক্কার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত হিসাব কষে তার পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তিনি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেননি। বাংলায় এই মুহূর্তে কোনো বিধানসভা নির্বাচন নেই। রাতারাতি সরকার পরিবর্তনের কোনো আইনি সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি। কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরে তৃণমূল কংগ্রেস যে নজিরবিহীন সাংগঠনিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তা ঢাকতেই মমতার এই দিল্লি যাত্রা।
ভারতের বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যে তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। এনডিটিভি এবং আনন্দবাজার–উভয় সূত্রই নিশ্চিত করেছে, দলের বহু বিধায়ক ইতিমধ্যেই দলত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি বর্ষীয়ান নেতা সুখেন্দু শেখর দল এবং রাজ্যসভার পদ থেকে সরে গেছেন। লোকসভা বলতে গেলে মমতার আওতার বাইরে এখন। লোকসভার ২৮ জন তৃণমূল সদস্যের মধ্যে ২০ জনই মমতাকে ছেড়ে যোগ দিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরে। বিদ্রোহীরা বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ-তে যোগ দিতে চাইছেন। গতকাল সোমবার রাতেও বৈঠক করেছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা।
বাংলায় যখন রাজ্যস্তরের দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং দলবদল নিয়ে তৃণমূল সম্পূর্ণ কোণঠাসা, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব চতুরতার সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করতে চাইছেন
এতে দলীয় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। শুধু বিধানসভা ও লোকসভাই নয়, ভাঙন ধরেছে কলকাতার প্রশাসনেও। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের একাধিক কাউন্সিলরও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে খোলাখুলি বিদ্রোহ ঘোষণা করে পদত্যাগ করেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ, যা প্রতিদিন রাজ্য রাজনীতির মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, তৃণমূলের শীর্ষ নেতা ও রাজ্যসভার প্রবীণ সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ের মতো ব্যক্তিত্বের পদত্যাগ এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী তথা নেত্রী কোয়েল মল্লিকের দল ছাড়ার জল্পনা দলের ভেতরের অস্থিরতাকে চরম সীমায় নিয়ে গেছে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সমস্ত লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক সাংসদ ফোন ধরছেন না এবং গোপন স্থানে বৈঠক করছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এনডিটিভির কন্ট্রিবিউটিং এডিটর জয়ন্ত ঘোষাল বলছেন, এই তীব্র অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে দলের নজর ঘোরাতেই জাতীয় স্তরে পা বাড়াচ্ছেন মমতা।
ভারতের আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, বাংলায় যখন রাজ্যস্তরের দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং দলবদল নিয়ে তৃণমূল সম্পূর্ণ কোণঠাসা, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব চতুরতার সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুকে কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করতে চাইছেন।
রাজ্যে ‘ডিফেন্সিভ’ অবস্থানে থাকার চেয়ে জাতীয় স্তরে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘অফেনসিভ’ রাজনীতি করা অনেক বেশি লাভজনক–এটিই মমতার বর্তমান রণকৌশল। আর সেই পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ উত্থান। এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছেন না মমতা।
জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে এমন কিছু ইস্যু রয়েছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সেই ইস্যুগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এর মধ্যে রয়েছে–
অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব: দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানহীনতা এবং রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিকে সামনে রেখে আমজনতার ক্ষোভকে পুঁজি করা।
পররাষ্ট্র নীতির ব্যর্থতা: মোদি সরকারের পররাষ্ট্র নীতিতে ‘অসংলগ্নতা’ বা ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনকে (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে বিলম্ব) জাতীয় মঞ্চে বড় বিতর্ক হিসেবে তুলে ধরা।
‘মডেল কেস’: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতে, বাংলার নির্বাচনে প্রশাসনিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেগুলোকে রাজ্যের পরাজয়ের গ্লানি হিসেবে না দেখে বরং বিজেপির দ্বারা ‘গণতন্ত্র হরণ’-এর একটি সর্বভারতীয় মডেল কেস হিসেবে বিরোধী জোটে পেশ করার পরিকল্পনা করছেন মমতা।

নির্বাচনের আগে এবং পরে মমতার অবস্থানের এক বিরাট ‘ইউ-টার্ন’ লক্ষ্য করা গেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূল এবং কংগ্রেসের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বা আসন সমঝোতা ছিল না। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও পরবর্তীতে জনসমক্ষে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মমতার সাথে একটি কৌশলগত বোঝাপড়া চেয়েছিলেন এবং বাংলার কংগ্রেস নেতৃত্ব জোটের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত ছিল।
কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণে মমতা তাতে সাড়া দেননি। সম্ভবত তিনি ভাবেননি যে নির্বাচনের ফলাফল এতটা বিপর্যয়কর হবে।
বাংলা সংবাদপত্র এই সময়-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরাজয়ের পর এই কৌশলগত ভুল বুঝতে পেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ (ক্ষতিপূরণ) নেমেছেন। তিনি আবার নিয়মিত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন। তবে এবারের যোগদানে একটি সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে। আগে যেখানে মমতা নিজেকে বিরোধী জোটের একমাত্র বা প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরার আগ্রাসী চেষ্টা করতেন–এবার তিনি সেই ভুল করছেন না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের সর্বাধিনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করছেন না। তিনি কোনো প্রধানমন্ত্রীত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সরাসরি প্রকাশ না করে নিজেকে একজন অত্যন্ত ‘সহযোগিতাপূর্ণ এবং সক্রিয় অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরছেন। তার মূল লক্ষ্য এখন নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়া নয় বরং বিরোধী সংহতি বজায় রাখা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মমতার এই জাতীয় রাজনীতির তৎপরতার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো সংসদের আসন্ন অধিবেশন। তৃণমূল নেতৃত্ব মনে করছে, যদি লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সুদৃঢ় করা যায়, তবে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও সুশাসনের অভাব নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে সংসদের ভেতরেই চরম কোণঠাসা করা সম্ভব হবে।
যদিও পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন ২০২৯ সালে। তা এখনো অনেক দূরে, তবুও মমতার হিসাব পরিষ্কার: সংসদীয় চাপ বাড়িয়ে জাতীয় স্তরে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া তৈরি করা। এর ফলে একদিকে যেমন জাতীয় স্তরে তার প্রাসঙ্গিকতা বাড়বে, অন্যদিকে বাংলার মানুষের কাছেও বার্তা যাবে যে, মমতাই বিজেপির বিরুদ্ধে প্রধান জাতীয় বিকল্প।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি এখন আর কেবল পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এবং থাকা সম্ভবও নয়। তৃণমূলের প্রথাগত ভোটব্যাংক এত সহজে রাতারাতি বিলীন হয়ে যাবে না। দলটির ভেতরে এখনো বহু নেতা বিশ্বাস করেন যে পরিস্থিতি আবার বদলাবে এবং রাজ্যে একটি তীব্র বিজেপি-বিরোধী হাওয়া তৈরি হবে। কিন্তু সেই সময়টুকু পাওয়ার জন্য এবং দলের সাংসদদের বিজেপির হাত থেকে বাঁচাতে মমতার সামনে দিল্লির আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় কমই আছে।