Advertisement Banner

ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে যা যা বলেছেন ট্রাম্প

গত দুই মাস ধরে ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন যে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে আর বেশি দেরি নেই।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে যা যা বলেছেন ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ প্রায় দুই মাস ছাড়িয়েছে। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৭ বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ‘একটি চুক্তি খুব শিগগিরই হতে যাচ্ছে’ বা ‘ইরান চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে’।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

গত ৭ এপ্রিল ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষ ‘অনেক দূর এগিয়েছে’ এবং চূড়ান্তভাবে চুক্তি সম্পন্ন করতে আরও দুই সপ্তাহ লাগবে। কিন্তু কোনো সমাধান আসেনি। এরপরও গত দুই মাস ধরে ট্রাম্প বারবার ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন যে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে আর বেশি দেরি নেই।

৭ এপ্রিলের তুলনায় এখন পরিস্থিতি যে খুব একটা বদলেছে, তারও কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তারপরও ট্রাম্প একই কথা বলে যাচ্ছেন। সমালোচকদের মতে, হয়ত তিনি বাস্তবতা বুঝতে পারছেন না, অথবা আর্থিক বাজারকে শান্ত রাখতে চাইছেন, কিংবা বারবার বলার মাধ্যমে চুক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে চাচ্ছেন।

তবে এখন আর তার এই দাবিগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কোনো কারণ নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত ২৩ মার্চ থেকে এসব বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন ট্রাম্প। যুদ্ধ শুরুর এক মাসও হয়নি তখন। এয়ার ফোর্স ওয়ানের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প কথিত শান্তি আলোচনা নিয়ে বলেন, “বড় বড় বিষয়গুলোতে আমরা একমত হয়েছি–আমি বলব, প্রায় সব বিষয়েই একমত হয়েছি।” তবে বাস্তবে ইরান তখন এমন কোনো আলোচনার কথাই অস্বীকার করেছিল।

পরদিন থেকেই ট্রাম্প বলতে শুরু করেন, ইরান নাকি চুক্তি করতে মরিয়া। তিনি তখন বলেছিলেন, “আমার মনে হয় আমরা এটি শেষ করতে পারব। তবে আমি শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।”

২৫ মার্চ তার দাবি আরও জোরালো হতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ইরান ‘মরিয়া হয়ে’ চুক্তি করতে চায়। আর ২৬ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেন, ইরান ‘চুক্তির জন্য অনুরোধ করছে’।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি ইরান সত্যিই এতটা আগ্রহী হয়ে থাকে, তাহলে আড়াই মাস পরও কেন সেই চুক্তি হয়নি?

২৯ মার্চ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন? জবাবে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমি ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে দেখছি।”

সিএনএন বলছে, এরপর থেকে ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী আরও জোরাল হতে থাকে। ৬ এপ্রিল তিনি বলেন, একটি বাধা তৈরি হওয়ার আগে দুই পক্ষ ‘চুক্তির খুব কাছাকাছি’ পৌঁছে গিয়েছিল। পরদিন তিনি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির সময়ের মধ্যেই উভয় পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাবে।

এরপর ১৫ এপ্রিল ফক্স বিজনেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয় বিষয়টি শেষের খুব কাছাকাছি। আমি এটিকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার অবস্থায় দেখছি।” তিনি আরও বলেন, “দেখা যাক কী হয়। আমার মনে হয় তারা খুবই আগ্রহের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চায়।”

পরবর্তী কয়েক দিনে ট্রাম্প প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলতে থাকেন যে চুক্তি হয়ে যাবে। ১৬ এপ্রিল তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার খুব ভালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি একটি ভালো চুক্তি হবে।”

১৭ এপ্রিল তিনটি আলাদা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘সবকিছুতে সম্মত হয়েছে’, ‘আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই চুক্তি হয়ে যাবে’ এবং ‘দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই’।

পরে ২০ এপ্রিল ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “সবকিছুই তুলনামূলক দ্রুত ঘটবে।”

কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তারপরও ৩০ এপ্রিল ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এখনো চুক্তি করতে ভীষণ আগ্রহী বা মরিয়া হয়ে আছে।

১ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “যুদ্ধ শেষ হবে, আর সেটা খুব বেশি দূরে নয়...।”

এরপর কিছুদিন এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী থেকে বিরত থাকলেও ১৮ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুরোধে তিনি ইরানে সামরিক হামলা দুই থেকে তিন দিনের জন্য স্থগিত রেখেছেন। কারণ, তাদের ধারণা ছিল উভয় পক্ষ একটি চুক্তি হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এ সময় ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেন যে, এর আগেও এমন অনেকবার হয়েছে, যখন চুক্তি হওয়ার আশা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, “আগেও এমন সময় এসেছে যখন আমরা ভেবেছিলাম চুক্তি প্রায় হয়ে গেছে, কিন্তু তা হয়নি।” তবে সঙ্গে সঙ্গে বলেন, “কিন্তু এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন।”

সিএনএনের ভাষ্য, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল না। তবুও ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। ১৯ মে কংগ্রেসের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমরা খুব দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান ঘটাব।”

২৩ মে ট্রাম্প আবারও চুক্তি নিয়ে একের পর এক আশাবাদী মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, তার প্রশাসন চুক্তির আরও কাছাকাছি পৌঁছেছে। চুক্তির বেশির ভাগ বিষয় নিয়ে সমঝোতা হয়ে গেছে, শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, খুব শিগগিরই চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হবে এবং শেষ পর্যায়ের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।

২৮ মে পুত্রবধূ লারা ট্রাম্পকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “দুই পক্ষ খুব ভালো একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে।” এরপর ৭ জুন তিনি দাবি করেন, চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে উভয় পক্ষ। তবে ইরান ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সংঘাতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমসাধ্যম অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। এটি একটি ভালো চুক্তি হবে। বর্তমানে যা ঘটছে, তার কারণে আমি চাই না এটি ভেস্তে যাক।” এটি নিয়ে তৃতীয়বারের মতো অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেছেন যে চুক্তি প্রায় হয়ে গেছে।

এরপর গতকাল সোমবার সাউথ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের সমর্থনে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সমাবেশে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই ‘পূর্ণ বিজয়’ অর্জিত হবে। তিনি বলেন, “আমরা এখন আলোচনা করছি। তারা খুব ভালো একটি চুক্তি করতে চায়।”

পরে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, “আমরা যা চাই, তারা সবকিছু দিতে প্রস্তুত।”

সম্পর্কিত