জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বোর্ড চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে আবার জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে এই নিয়োগের বিরোধিতা করছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, “ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কাউকে টানাটানির সুযোগ দেব না।” প্রশ্ন হচ্ছে, একটি বেসরকারি ব্যাংক নিয়ে রাজনৈতিক দল জামায়াত এত স্পর্শকাতর কেন? জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কি এই ব্যাংকের মালিক?
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক কোনো দলের না, ব্যাংক চলে আমানতকারীর টাকায়। আমানত থাকে বলেই মালিকদেরও বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা শুনতে হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন মানতে হয়। আমানত রক্ষার স্বার্থেই ব্যাংকগুলোর তদারকি করার আইনগত দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে কি পারছে না, সেটা ভিন্ন আলোচনা। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মালিকানা ও কর্তৃত্ব খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ব্যাংকটির ৪১ বছরের মালিকানা বদলের ইতিহাসে।
দেশের প্রথম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে; উদ্যোক্তা ছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা আইডিবি, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস, সৌদি আরবের আল রাজি গ্রুপ, বাহরাইনের কিছু প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ সরকার। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় আইডিবি’র শেয়ার ছিল ৭.৫ শতাংশ, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস, আল রাজি গ্রুপ, বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ার ছিল ৩০ শতাংশ, বাংলাদেশ সরকারের শেয়ার ছিল ৫ শতাংশ এবং বাকি ৫৭ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল সাধারণ পাবলিক ও দেশি উদ্যোক্তা।
পাবলিক শেয়ার বেশি কিনেছে জামায়াতের লোকজন। দেখা যাচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকে জামায়াতের কোনো নেতা সরাসরি বড় শেয়ারহোল্ডার নন, কিন্তু প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্যাংকের পরিচালনা তাদের হাতে ছিল- প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবু নাসের মুহাম্মদ আবদুজ জাহের, পরবর্তীতে মোস্তফা আনোয়ার, শাহ আবদুল হান্নানসহ শীর্ষ পদগুলোতে জামায়াত ঘনিষ্ঠরাই ছিলেন। কারণ বিদেশি মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের বোর্ডে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে জামায়াত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মনোনীত করেছিল, তবে এটা সম্ভবত কোনো লিখিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, মৌখিক সমঝোতা ও প্রক্সির মাধ্যমে হয়েছে।
২০১৬ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক ছিল দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক, এই সময়ে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে লাভ করেছে, আমানত ছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণ ছিল ৪ শতাংশের নিচে। বিদেশি রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকটি ছিল শীর্ষে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যামেল রেটিংয়ে ছিল ‘স্ট্রং’ ক্যাটাগরিতে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি এক দিনেই বদলে যায় ব্যাংকের বোর্ড বা পরিচালক পর্ষদ, ব্যাংক পরিচালনার কর্তৃত্ব হারায় জামায়াতে ইসলাম। বাজারে গুঞ্জন ওঠে, সরকারের সবুজ সংকেতেই এই পরিবর্তন। এই গুঞ্জনের যৌক্তিকতা আছে, কারণ জামায়াতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত নড়বড় করে দেওয়ার পরিকল্পনায় সরকারের সংশ্লিষ্টতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে যা কিছু হয়েছে তা আইন মাফিক হয়েছে।
২০১৭-২০২২ সনের মধ্যে আইডিবি তাদের শেয়ার ৭.৫% থেকে কমিয়ে ২% এ নামিয়ে আনে, আল রাজি গ্রুপ, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউসও তাদের শেয়ার ছেড়ে দেয় এবং এই শেয়ারগুলো ধাপে ধাপে কিনে নেয় এস আলম সংশ্লিষ্ট ৮-১০টি কোম্পানি, ফলে এস আলম সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত শেয়ার ৩০% ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে ব্যাংকের পরিচালনার কর্তৃত্ব চলে যায় এল আলমের হাতে। কিন্তু তাতেও ব্যাংকের ভিত্তি স্ট্রং ছিল, ২০১৭ সনের ৮৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ২০২৩ সনে ডিসেম্বরে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি।
ইসলামী ব্যাংকের মূল সমস্যা ঋণ বিতরণে, ঋণ বিতরণে বেনামি ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শুধু ২০২২ সনের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে যে ৯টি কোম্পানিকে ৭ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাদের ঠিকানা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ ছিল এস আলমের, বিনিয়োগের খাত অজ্ঞাত থাকায় গৃহীত ঋণের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাংক ছিল অন্ধকারে। ফলে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে, ২০১৬ সনের ৩.৭৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সনে দাঁড়ায় ১৮.৫৩ শতাংশে। ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৩১ শতাংশ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৬৯ শতাংশ ঋণের অবস্থা ভালো হলে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক সঙ্কট এত তীব্র হওয়ার কথা নয়। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর এস আলমকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে অন্য ঋণ খেলাপিদের দম নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
৫ আগস্টে সরকার পতনের পর দিনই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। জামায়াত আবার ইসলামী ব্যাংক দখল করে। ‘দখল’ শব্দটি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর। জামায়াতের দখলে যাওয়ার পর ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই এবং নতুন করে জামায়াত সমর্থকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির ওপর রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, কর্মী ছাঁটাই এবং নিজেদের লোক নিয়োগ প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি না থাকলে সম্ভব হতো না। আওয়ামী লীগ আমলে সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে এস আলম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াত। বিএনপি বোর্ডের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে ব্যাংকটিকে জামায়াত-নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করছে।
শুধু বোর্ড আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন করে জামায়াতকে ব্যাংক থেকে বিযুক্ত করা যাবে না, কারণ ইসলামী ব্যাংককে জামায়াত তাদের ‘ইসলামী অর্থনীতির মডেল’ মনে করে, দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন এই ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়। দ্বিতীয়ত, সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের বড় অংশ এই ব্যাংকে চাকরি করে, ২০১৭ সালের আগে ১৯ হাজার কর্মীর ৮০ শতাংশ জামায়াত সংশ্লিষ্ট ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, এমডি থেকে পিয়ন-সব নিয়োগে শিবির বা জামায়াতের সুপারিশ লাগত।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের জাকাত ফান্ড, সিএসআর ফান্ড দিয়ে দলীয় কর্মসূচি চালানোর অভিযোগও পুরনো। তাই জামায়াত ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডে পেশাদার ব্যাংকার চায় না, তারা চায় ‘বিশ্বস্ত’ কাউকে। বিদেশি শেয়ার এখনো ২০ শতাংশের মতো আছে। আইডিবি ২ শতাংশ শেয়ার রাখলেও তারা সক্রিয় নয়। বর্তমানে বিদেশি শেয়ারের বড় অংশ লন্ডনভিত্তিক কিছু ইনভেস্টমেন্ট ফাণ্ডের হাতে, যারা ব্যাংক পরিচালনায় নাক গলায় না। বাংলাদেশ সরকার মাত্র ৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলেও সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের আশীর্বাদ ব্যতীত জামায়াত ব্যাংক চালাতে পারবে না।
এই টানাপোড়েনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংক। তবে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক দুর্বল হওয়ার পেছনে ‘গুজব ও আস্থার সংকট’ বড় কারণ। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে পিনাকী ভট্টাচার্যসহ সরকারবিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালাতে থাকে যে, ‘ইসলামী ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে, টাকা তুলে নিন’। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না পাঠিয়ে প্রবাসীদের হুণ্ডিতে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করা হয়। ফলে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার আমানত তুলে নেয় গ্রাহক; রেমিট্যান্স ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অর্ধেকে নেমে আসে। ৫ আগস্টের পর গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের অবিবেচক কথাবার্তায় ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত নষ্ট হতে থাকে। ফলে ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। তাই শুধু এস আলম নয়, অন্য নিয়ামকগুলোও ব্যাংককে দুর্বল করার ক্ষেত্রে সমভাবে দায়ী।
ব্যাংক কোনো দলের না, আমানতকারীর। মালিকানা যারই হোক, ব্যাংক কোম্পানি আইন মানতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বদল করে ফেলে তা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য উদ্বেগজনক। রাজনীতি নয়, পেশাদারত্বই হোক ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার একমাত্র নীতি।
লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বোর্ড চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে আবার জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে এই নিয়োগের বিরোধিতা করছে। দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, “ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কাউকে টানাটানির সুযোগ দেব না।” প্রশ্ন হচ্ছে, একটি বেসরকারি ব্যাংক নিয়ে রাজনৈতিক দল জামায়াত এত স্পর্শকাতর কেন? জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কি এই ব্যাংকের মালিক?
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংক কোনো দলের না, ব্যাংক চলে আমানতকারীর টাকায়। আমানত থাকে বলেই মালিকদেরও বাংলাদেশ ব্যাংকের কথা শুনতে হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন মানতে হয়। আমানত রক্ষার স্বার্থেই ব্যাংকগুলোর তদারকি করার আইনগত দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছে কি পারছে না, সেটা ভিন্ন আলোচনা। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের মালিকানা ও কর্তৃত্ব খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ব্যাংকটির ৪১ বছরের মালিকানা বদলের ইতিহাসে।
দেশের প্রথম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে; উদ্যোক্তা ছিল ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা আইডিবি, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস, সৌদি আরবের আল রাজি গ্রুপ, বাহরাইনের কিছু প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ সরকার। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় আইডিবি’র শেয়ার ছিল ৭.৫ শতাংশ, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউস, আল রাজি গ্রুপ, বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংকের শেয়ার ছিল ৩০ শতাংশ, বাংলাদেশ সরকারের শেয়ার ছিল ৫ শতাংশ এবং বাকি ৫৭ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল সাধারণ পাবলিক ও দেশি উদ্যোক্তা।
পাবলিক শেয়ার বেশি কিনেছে জামায়াতের লোকজন। দেখা যাচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকে জামায়াতের কোনো নেতা সরাসরি বড় শেয়ারহোল্ডার নন, কিন্তু প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্যাংকের পরিচালনা তাদের হাতে ছিল- প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবু নাসের মুহাম্মদ আবদুজ জাহের, পরবর্তীতে মোস্তফা আনোয়ার, শাহ আবদুল হান্নানসহ শীর্ষ পদগুলোতে জামায়াত ঘনিষ্ঠরাই ছিলেন। কারণ বিদেশি মালিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের বোর্ডে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে জামায়াত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মনোনীত করেছিল, তবে এটা সম্ভবত কোনো লিখিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, মৌখিক সমঝোতা ও প্রক্সির মাধ্যমে হয়েছে।
২০১৬ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক ছিল দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক, এই সময়ে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে লাভ করেছে, আমানত ছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণ ছিল ৪ শতাংশের নিচে। বিদেশি রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকটি ছিল শীর্ষে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যামেল রেটিংয়ে ছিল ‘স্ট্রং’ ক্যাটাগরিতে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি এক দিনেই বদলে যায় ব্যাংকের বোর্ড বা পরিচালক পর্ষদ, ব্যাংক পরিচালনার কর্তৃত্ব হারায় জামায়াতে ইসলাম। বাজারে গুঞ্জন ওঠে, সরকারের সবুজ সংকেতেই এই পরিবর্তন। এই গুঞ্জনের যৌক্তিকতা আছে, কারণ জামায়াতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত নড়বড় করে দেওয়ার পরিকল্পনায় সরকারের সংশ্লিষ্টতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে যা কিছু হয়েছে তা আইন মাফিক হয়েছে।
২০১৭-২০২২ সনের মধ্যে আইডিবি তাদের শেয়ার ৭.৫% থেকে কমিয়ে ২% এ নামিয়ে আনে, আল রাজি গ্রুপ, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউসও তাদের শেয়ার ছেড়ে দেয় এবং এই শেয়ারগুলো ধাপে ধাপে কিনে নেয় এস আলম সংশ্লিষ্ট ৮-১০টি কোম্পানি, ফলে এস আলম সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত শেয়ার ৩০% ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে ব্যাংকের পরিচালনার কর্তৃত্ব চলে যায় এল আলমের হাতে। কিন্তু তাতেও ব্যাংকের ভিত্তি স্ট্রং ছিল, ২০১৭ সনের ৮৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ২০২৩ সনে ডিসেম্বরে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি।
ইসলামী ব্যাংকের মূল সমস্যা ঋণ বিতরণে, ঋণ বিতরণে বেনামি ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। শুধু ২০২২ সনের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে যে ৯টি কোম্পানিকে ৭ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাদের ঠিকানা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। নামসর্বস্ব এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ ছিল এস আলমের, বিনিয়োগের খাত অজ্ঞাত থাকায় গৃহীত ঋণের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাংক ছিল অন্ধকারে। ফলে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকে, ২০১৬ সনের ৩.৭৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সনে দাঁড়ায় ১৮.৫৩ শতাংশে। ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের ৩১ শতাংশ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৬৯ শতাংশ ঋণের অবস্থা ভালো হলে ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক সঙ্কট এত তীব্র হওয়ার কথা নয়। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর এস আলমকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়ে অন্য ঋণ খেলাপিদের দম নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
৫ আগস্টে সরকার পতনের পর দিনই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়। জামায়াত আবার ইসলামী ব্যাংক দখল করে। ‘দখল’ শব্দটি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর। জামায়াতের দখলে যাওয়ার পর ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই এবং নতুন করে জামায়াত সমর্থকদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির ওপর রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, কর্মী ছাঁটাই এবং নিজেদের লোক নিয়োগ প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতি না থাকলে সম্ভব হতো না। আওয়ামী লীগ আমলে সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে এস আলম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াত। বিএনপি বোর্ডের চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে ব্যাংকটিকে জামায়াত-নিরপেক্ষ করার চেষ্টা করছে।
শুধু বোর্ড আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন করে জামায়াতকে ব্যাংক থেকে বিযুক্ত করা যাবে না, কারণ ইসলামী ব্যাংককে জামায়াত তাদের ‘ইসলামী অর্থনীতির মডেল’ মনে করে, দলের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেন এই ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়। দ্বিতীয়ত, সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের বড় অংশ এই ব্যাংকে চাকরি করে, ২০১৭ সালের আগে ১৯ হাজার কর্মীর ৮০ শতাংশ জামায়াত সংশ্লিষ্ট ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে, এমডি থেকে পিয়ন-সব নিয়োগে শিবির বা জামায়াতের সুপারিশ লাগত।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের জাকাত ফান্ড, সিএসআর ফান্ড দিয়ে দলীয় কর্মসূচি চালানোর অভিযোগও পুরনো। তাই জামায়াত ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডে পেশাদার ব্যাংকার চায় না, তারা চায় ‘বিশ্বস্ত’ কাউকে। বিদেশি শেয়ার এখনো ২০ শতাংশের মতো আছে। আইডিবি ২ শতাংশ শেয়ার রাখলেও তারা সক্রিয় নয়। বর্তমানে বিদেশি শেয়ারের বড় অংশ লন্ডনভিত্তিক কিছু ইনভেস্টমেন্ট ফাণ্ডের হাতে, যারা ব্যাংক পরিচালনায় নাক গলায় না। বাংলাদেশ সরকার মাত্র ৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক হলেও সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের আশীর্বাদ ব্যতীত জামায়াত ব্যাংক চালাতে পারবে না।
এই টানাপোড়েনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংক। তবে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক দুর্বল হওয়ার পেছনে ‘গুজব ও আস্থার সংকট’ বড় কারণ। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে পিনাকী ভট্টাচার্যসহ সরকারবিরোধী অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালাতে থাকে যে, ‘ইসলামী ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে, টাকা তুলে নিন’। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ না পাঠিয়ে প্রবাসীদের হুণ্ডিতে অর্থ প্রেরণে উৎসাহিত করা হয়। ফলে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার আমানত তুলে নেয় গ্রাহক; রেমিট্যান্স ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে অর্ধেকে নেমে আসে। ৫ আগস্টের পর গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের অবিবেচক কথাবার্তায় ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা ক্রমাগত নষ্ট হতে থাকে। ফলে ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। তাই শুধু এস আলম নয়, অন্য নিয়ামকগুলোও ব্যাংককে দুর্বল করার ক্ষেত্রে সমভাবে দায়ী।
ব্যাংক কোনো দলের না, আমানতকারীর। মালিকানা যারই হোক, ব্যাংক কোম্পানি আইন মানতে হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বদল করে ফেলে তা ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য উদ্বেগজনক। রাজনীতি নয়, পেশাদারত্বই হোক ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার একমাত্র নীতি।
লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক